একজন ভালো ছাত্রের কষ্টের জীবন, খণ্ড ২,পর্ব৬
রিপনের সম্মান বেড়েই যাচ্ছে। সম্মানী হিসেবে সে আগে পেয়েছিলো একটা চটের বস্তা,এখন পেয়েছে একটা পুরনো গামছা।
বস্তার উপর গামছা পেতে সে মহুরিগিরী করছে।মহামান্য মহুরি। মহামান্য মহুরি ক্ষুধার্ত পেটে হিসেব লিখছে।
আশ্রয়হীন স্টেশনে এই বা কম কিসে?
" এ ভাই, হিসেবটা ঠিক মতো লিখছো তো? না -।ছমিরকে জিতিয়ে দিচ্ছো?"
কণ্ঠে কোনো মায়াদয়া নেই। চাছা ছোলা প্রশ্ন। রিপন শুকনো মুখে তাকালো।পূর্ব পাশের চিকন লোকটা আড় চোখে তাকিয়ে আছে। প্রশ্নটা সেই করেছে। তার নাম নাজিম।তার এক চোখ হাতে ধরা তাসে অন্য চোখ রিপনের মুখে।
" না।মানে।ঠিকই তো লিখছি।এই দেখেন।" রিপন আমতা আমতা করে জবাব দিলো।
" কই,দেখি?"
দক্ষিণ পাশের লোকটা খেঁকিয়ে উঠলো।
" এই শালার মুর্খ নাজিম। খাতা দেখবি, তুই পড়তে পারিস? এই ছুরি দেখেছিস? শালা ভুড়ি নামিয়ে দেবো।"
কাসেমের হাতে ছুরি।
তাস খেলা বন্ধ। নাজিম দা বের করেছে। নতুন চকচকে দা।রিপন ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে। এখনি খুনোখুনি, রক্তারক্তি হবে না-কি? এ সে কাদের মহুরিগিরি করছে?এরা ডাকাত দল নাতো?
"এই দেখ দা।বাঁশ কাটার জন্য কিনেছিলাম এখন তোর হাত কাটবো। শুয়োরের বাচ্চা। লোক চিনিস।দে বিড়ি দে।বাইনচোত।"
বিশাল হুমকি, চাঁদা সামান্য। রিপন হা করে তাকিয়ে আছে। কাসেম সিগারেট বের করে নাজিমের মুখে ছুড়ে মেরেছে।
" এই নে কুত্তার বাচ্চা। খা, জম্মের খাওয়া খা।শালা, চাচা নামের কলঙ্ক।"
নাজিমের উদ্দেশ্যে চোখ লাল করে কথাগুলো কাসেম বললো।কাসেম লোকটা কালো,গাট্টা গোট্টা।নাজিমকে ধরে আছাড় দিতে পারে।
নাজিম হেসে পাল্টা উত্তর দিলো," আমি কুত্তার বাচ্চা হলে তুই তো কুত্তা। কারন তুই তো আমার বাপ।"
হঠাৎ যেমন আগ্নেয়গিরি জ্বলে উঠেছিলো আবার তেমন সম্পর্কের শীতল সুন্দর নীরবতা। আবার বিড়ি খাওয়া চলছে, আগুন জ্বলছে, তাস খেলা চলছে। রিপন বিস্ময়ে হা করে তাকিয়ে আছে।
এ কারা,এ কী?
পরে সে বুঝলো, এরা এইরকমই।সব নিজেরা নিজেরা।
হাবিল কাবিল ও নিজেরা নিজেরা ছিলো। এক ভাই খুন করেছিলো আরেক ভাইকে।গ্যাঞ্জাম, মারামারি নিজেরা নিজেরাই বেশি হয়।
রিপন চিন্তায় পড়ে গেলো।সে বুঝলো, এরা প্রচণ্ড আবেগপ্রবন।সামান্য কারণে যখনতখন এরা আবার মারমুখী হয়ে যেতে পারে।
এখান থেকে উঠে যাওয়াই ভালো।উঠে গেলে আশ্রয়টা হারিয়ে যেতে পারে।রাতে এখানে চটটির উপর শুয়ে দিব্যি ঘুম দেওয়া যাবে।এরা দুটো মশার কয়েল জ্বালিয়েছে।এখানে মশা লাগছে না। আশ্রয়টা মোটামুটি নিরাপদ। তবু রিপন উঠে পড়লো।বুদ্ধি খাটিয়ে বললো," খুব প্রচ্ছাব চেপেছে। একটু প্রচ্ছাব করে আসি।"
" আচ্ছা যা,তাড়াতাড়ি আসিস।" দক্ষিণ পাশে বসে থাকা রোগা পাতলা লোকটা আদেশের সুরে কথাটা বললো।সে এদের দলনেতা। লোকটার নাম মোস্তফা।
" আচ্ছা, খাতা নেন।"
রিপনের হাত থেকে খাতা নিয়ে মোস্তফা বললো," এ মনি দাঁড়া। তোর হাতের লেখা তো খুব সুন্দর। কিসে পড়িস?"
" এইবার আই,এ পরিক্ষার্থী। "
" লেখা পড়ায় তো খুব ভালো মনে হচ্ছে। এস,এস, সি রেজাল্ট কী?"
" জ্বি।স্কুল সেরা।"
" হুম। এখানে কেন?কোথায় যাবি?"
"ঢাকা, কাজের জন্য। বাড়িতে সৎমা।"
" তুই আমার সাথে চল।আমার একটা মামাতো বোন আছে, দেখতে সুন্দরী। কিন্তু সে লেখা পড়ায় গবেট।সামনে এসএসসি পরীক্ষা দেবে।সওকোত চেয়ারম্যানের নাম শুনেছিস? আমার মামা।তুই আমার বোনটাকে পড়াবি।যাবি?"
" পড়ালেখা আর করবো না। "
" কেন?"
" সে অনেক কথা। এই লেখা পড়া এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু।এর জন্য আজ আমি আজ ঘর ছাড়া।মানুষের চোখের শত্রু।অতিরিক্ত ভালো ছাত্রত্ব আজ আমার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।আমি আর লেখাপড়ার ধারেকাছেও যেতে চাই না। "
নাজিম ফট করে বললো," তুই আমার সাথে চল।আমার ভুট্টার আবাদ আছে।ভুট্টার খেতে কাজ করতে পারবি না?"
" পারবো।"
" করেছিস কখনো?"
" না।"
কাসেম বললো," তুই আমার সাথে চল।আমার কলার আবাদ আছে। "
নাজিম বললো," শালা, তোর কলা কেটে দেবো, চুপ করলি না।"
সাথে সাথে নাজিম দা বের করলো।আবার গ্যাঞ্জাম।রিপন পা বাড়ালো স্টেশনের দক্ষিণ দিকে। সামনে একটা মোটা রেইনট্রি কড়াই দেখা যাচ্ছে। তার আড়ালে দাঁড়িয়ে আরাম করে খালি হওয়া যাবে। এখানে এদের সাথে আর নয়।যেকোনো সময় রক্তারক্তি হতে পারে।
রিপন বেরিয়ে পড়লো।স্টেশন মাস্টারের ঘরের দক্ষিণ পাশে প্লাটফর্মের ওটা কী পড়ে আছে? বস্তাবন্দি লাশ! রিপন থমকে দাঁড়ালো।
হ্যা,পুরনো চিনির বস্তার ভিতর একটা আস্ত লাশই তো পড়ে আছে উত্তর -দক্ষিণ। লাশটার পাশে কেউ নেই। হতেপারে ওটা কোনো ভবঘুরে ছিন্নমূল টোকাইয়ের লাশ।সে যে মারা গেছে কেউ হয়তো টের পায়নি।দিনের বেলায় হয়তো পুলিশ আসবে, তারপর বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হবে। কিন্তু এখন রিপন এই দুপুর রাতে ওর পাশ দিয়ে কীভাবে যাবে?
না যেয়েও উপায় নেই। সে পেছনে ফিরে যাবে না।পেছনে ফিরে গেলে সে নিজেই খুনোখুনির ভিতর পড়ে লাশ হয়ে যাবে।নিরুপায় রিপন অনেক কষ্টে অনেক সাহস সঞ্চয় করে পাশকাটিয়ে এগুতে লাগলো।তার নজর লাশের উপর আটকে আছে। হঠাৎ একটা খসমস শব্দ। ও আল্লাহ! লাশটা নড়ে উঠলো না-কি? হ্যা,তাইতো।একটা লম্বা নিঃশ্বাস। আবার খসমস শব্দ। তারপর আবার নিস্তব্ধতা। রিপন সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে গেলো।
নাহ! লাশ না,একটা জীবন্ত মানুষ। একটা বস্তার ভিতর পা থেকে কোমর।আরেকটা বস্তার ভিতর মাথা থেকে কোমর।দুটো পুরনো চিনির বস্তার একটা আস্ত বাড়ি তার।এই বাড়ির ভিতর একজন ছিন্নমূল স্টেশন বাসি দিব্যি আরাম করে ঘুমাচ্ছে। তার বুদ্ধি দেখে মশার পাল হতভম্ব। এ কী! তারা রহস্য উদ্ধারের জন্য, বস্তার ভিতর ঢোকার জন্য ওড়াউড়ি করছে। পারছে না। শেষে রাগে গুনগুন, গুনগুন আওয়াজ করে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। মশাকে এইভাবে ফাঁকি দেওয়া বিরাট বুদ্ধির কাজ।শুধু বিরাট না ভয়াবহ বিরাট।
এই ভয়াবহ বুদ্ধি নিয়ে একজন মানুষ ছিন্নমূল হয়ে গেছে।
প্রচন্ড প্রচ্ছাবের বেগ চেপেছে। রিপন দ্রুত পা চালালো।পূর্বপশ্চিম লম্বা লম্বি বেঞ্চটার উপর ওটা কী? এযে ছোটো খাটো একটা হাতি।বিশাল মোটা কালো ভুতো একটা লোক অঘোরে ঘুমাচ্ছে। সে প্রায় উলঙ্গ। পরনে শুধু একটা লুঙ্গি। হাটু পর্যন্ত ঢাকা।লোকটার মশার প্রতি খুব মায়া।শত-শত মশা তার হাতে,পায়ে,মুখে - সমস্ত শরীর জুড়ে।মশাগুলো রক্ত খেয়ে লাল ঢোল হয়ে আছে। বাকিগুলো তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
দুটো বস্তা কি পাওয়া যাবে? পেলেও কি সে ঐ লোকটার মতো বস্তায় ঢুকে ঘুমাতে পারবে? মোটা লোকটার মতো অবস্থায় নিজেকে সে কল্পনাও করতে করতে ভয় পাচ্ছে।
নিরুপায় রিপন প্রচ্ছাব করে আর দেরি করলো না। খুনোখুনির রাজ্যে আবার বাধ্য হয়েই সে ফিরে এলো।ফিরে এসে দেখলো, বিপুল বেগে তাস খেলা চলছে। কিন্তু তার বস্তা আর গামছার রাজাসনটি হাতছাড়া হয়ে গেছে।তার উপর একটা মানুষ গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে।
রিপন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ তাকে খেয়াল করছে না। কেউ তাকে বসতেও বলছে না।সে এখন কী করবে?
একজন ভালো ছাত্রের কষ্টের জীবন, খন্ড ২,পর্ব৬
হুমায়ূন কবীর
১৯/৫/২৬

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন