ক্যাম্পাস-প্রেম,প্রেমেরউপন্যাস

  



প্রেম এবং রাজনীতির এক দূরান্ত কাহিনী। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সোনালী  সময়গুলোর উপর  কাব্যিক পরশ।

 (রোমান্টিকপ্রেমের উপন্যাস) 

ক্যাম্পাস- প্রেম


হুমায়ূন কবীর,মাসয


(১)

তুমি চলে গেছো। এখনো সমস্ত ঘরে তোমার শরীরের ঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে। আমি জল পদ্মের ঘ্রাণ পাচ্ছি, তোমার শরীরের ঘ্রাণ। মনে হচ্ছে এইতো তুমি, আমার পাশে মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছ। ঘাড় ঘোরালেই দেখতে পাব। আশায় বুক বেধে বার বার ঘাড় ঘোরাচ্ছি আর বার বার বিফল হচ্ছি। তুমি নেই তুমি চলে গেছো। টেবিলের উপর ফুল গুলি পড়ে আছে।

আজ আমার সেই সমস্ত দিনগুলির কথা বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে। আর কষ্টের নোনা জলে চোখ ভিজে যাচ্ছে। এই তো সেদিনের কথা। হাত বাড়ালেই ছুয়ে দেখা যায়। অথচ দেখতে দেখতে কতগুলো বছর কেটে গেছে। তুমি আজ ঢাকা ভার্সিটির 'ল' ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট। তোমার সামনে উজ্জ্বল তারকা খচিত দিন। আর আমার চারপাশ অন্ধকার, শুধু অন্ধকার। কেন তুমি আমাকে এভাবে কাঁদালে?

আমার সামনে এখন এম, এম কলেজের সেই সুখ স্মৃতিময় দিনগুলি। সেই সুখ স্মৃতি যেন এসিড। প্রচন্ড তৃষ্ণা নিয়ে যত পান করছি ততো জ্বলছি। দেহমন জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। তবু সেই দিন গুলিই এখন আমার একমাত্র সম্বল। কেন তুমি আমার জীবনে এসেছিলে রাশমিন?

এই তো সেদিন তোমাকে একনজর দেখার জন্য সারারাত আল্লাহকে ডাকতাম। কখন সকাল হবে। এম, এম কলেজের ক্যাম্পাস সরব হবে। তুমি ক্লাস করতে আসবে। তোমাকে এক নজর দেখতে পাব। আর কিছু নয় শুধু চোখ দু'টি। যে চোখ কোন কথা না বলেও হাজারও কথা বলে প্রতিনিয়ত। শুনেছি টাইম মেশিন নামে কি এক বস্তু বিজ্ঞানিদের মাথায় আছে। টাইম মেশিনে চড়ে নাকি ইচ্ছে মাফিক অতীত বা ভবিষ্যতে চলে যাওয়া যায়। যদি একটা সত্যিকারের টাইম মেশিন পেতাম তবে তাতে চড়ে ফিরে যেতাম কয়েক বছর অতীতে। এম, এম কলেজের ক্যাম্পাসে যেখানে, তোমার আমার প্রথম দেখা, প্রথম পরিচয় প্রেম এবং অতঃপর-

মনে আছে তোমার সেই প্রথম পরিচয়ের দিনটির কথা? মনে পড়লে শত দুঃখের ভিতর হেসে উঠি। তোমাকে তুই বলে সম্বোধন করেছিলাম। তুমি সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বলেছিলে, "দেখেন, তুই বলা আমি পছন্দ করি না। এটা কোন ধরনের ভদ্রতা?" আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। কারণ, আমি একজন ছাত্র নেতা, আর রজনীতিতে সিনিয়ররা জুনিয়রদের তুই বলে সম্মোধন করে। এবং এভাবেই পরস্পরের কাছে আসে। সম্পর্ক আরো গাঢ় হয়। কিন্তু রাজনৈতিক কালচার আর কলেজ কালচার এক নাও হতে পারে। এক না হলেও কেউ প্রতিবাদ করে না। রাশমিন করেছিল কারণ তার সাহসের অভাব ছিল না। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ছিল না।

মনে পড়ছে। সকাল নয়টা কি দশটা হবে। সকালের নাস্তা সেরে দ্বিতীয় রাউন্ডের ঘুম ঘুমাচ্ছিলাম। এম, এম কলেজের শহীদ আসাদ হল তখন প্রায় একরকম ফাঁকা। আমার ৩০১ নম্বর রুমে শুধু মাত্র আমি একা আছি। আর সবাই ক্যাম্পাসে, কেননা -এখন ভর্তি পরীক্ষার মৌসুম চলছে। কত জায়গা থেকে কত রকম ছেলেমেয়ে আসতে শুরু করেছে। কত রকম পোশাক আশাক তাদের। কত রকম স্টাইল। ছাত্র-ছাত্রী অভিভাবকে ক্যাম্পাস এখন জম-জমাট। সূচ ফেলার জায়গা পর্যন্ত নেই। যেন ক্যাম্পাসে মেলা বসেছে। উৎসব উৎসব পরিবেশ। ভর্তি পরীক্ষার জন্য যারা ফর্ম তুলতে আসছে, সেই সমস্ত তরুন-তরুনীদের দৃষ্টি আকর্ষন বা শোডাউনের জন্য প্রতিটা রাজনৈতিক দল বা সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন রকম আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করেছে। আমার দল ও পিছিয়ে নেই। আমি অন্যান্য বার সক্রিয় অংশগ্রহণ করি কিন্তু এবার ভাল লাগছে না। আমরা যে সমস্ত ছেলে-মেয়েদের ফর্ম তোলা থেকে শুরু করে ফর্ম জমা দেয়া পর্যন্ত প্রতিটা স্টেজে যেভাবে হেল্প করি, অথচ দু'দিন পর সেই সমস্ত ছেলে-মেয়ে ক্যাম্পাসে ভর্তি হয়ে সামান্য কৃতজ্ঞতা পর্যন্ত প্রকাশ করে না। এগুলো গায়ে সয়ে গেছে, কিন্তু মাধুরীর কথা মনে পড়লে ঘৃনায় মনটা কুকড়ে আসে, ইচ্ছে হয় না কাউকে হেল্প করি। তারপরও যাই, তারপরও হেল্প করি।

কিন্তু আজ মনটা আমার একদম ভাল নেই, সকাল বেলা পুকুরে গোসল করতে গিয়ে দেখি - পুকুর পাড়ে গাছের শিকড়ের উপর মাধুরি বসে আছে একটি ছেলের কাধে মাথা রেখে। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেছে। গোসল না করে পুকুর থেকে উঠে এসে হলের বাথরুমে গোসল করেছি, সেই থেকে মনটা খারাপঃ বারবার ঘুমাবার চেষ্টা করেছি কিন্তু ঘুম আসছে না, শেষে ঘুমের বড়ি খেয়ে ঘুমাচ্ছি।




(২)


তুষার, এই তুষার, ষাড়ের মত চিল্লাতে চিলাতে দরজা টরজা হুড়মুড় করে ঠেলে তৌফিক রুমে প্রবেশ করলো, যেন বাইরে সিডর শুরু হয়েছে আর ও দৌড়ে পালিয়ে এসে আমাকে সর্তক হতে বলছে। এটা ওর স্বভাব।

তাকিয়ে দেখি তার হাতে পানির গ্লাস, মুখে রাজ্য বিজয়ের হাসি।

তৌফিক রুমে ঢুকে তার চির-পরিচিত ক্যাবলা ক্যালাস মার্কা হাসি দিয়ে বলল, কিরে শালার পাগল, বাংলার বাউল, এখন সকাল দশটার সময় শুয়ে আছিস কেন? আমি রেগে বললাম-   ঘুমাচ্ছি, ডিস্টার্ব করিস না, যেখানে যাচ্ছিস সেখানে যা।

, যেন আমার রুমে কেউ আসেনি এমনি অবহেলায় পাশ ফিরে কাত হয়ে শুলাম। হঠাৎ কানের ভিতর তরল কিছু গড়িয়ে পড়ল, যেন পৃথিবীটা তরল হয়ে কানের ভিতর ঢুকে গেছে। আমি লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে ফ্লোরের উপর পড়লাম। তৌফিক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে দৌড়ে রুমের এক কোণায় আশ্রয় নিল।

"হারামজাদা কানে পানি দিলি কেন রে?" রাগে চিৎকার করে উঠলাম তৌফিক ঘরে দরজায় লাগানো হুক এক হাতে ধরে হাসতে হাসতে বলল,"শালা গালাগালি করিস না, পিটিয়ে আলু ভর্তা বানাবো কিন্তু। "

কি আর করা নিরস্ত্র হতে হল, হারামজাদার কথা বলা যায় না -হুকটা মাথায় বসিয়ে দিতে পারে। শালার যে গাট্টাগোট্টা শরীর। বললাম, "দে পানির গ্লাস দে।"

তৌফিক পানির গ্লাস এগিয়ে দিতে দিতে বলল, "নে এবার ভাল করে ঘুমা।"

ঘুমানো তো দূরের কথা কানের পানি বের করার জন্য আরো পানি দিয়ে নাচানাচি করে তবে কানের পানি বের করতে হল। নাচানাচি করে ক্লান্ত হয়ে বেডে বসে সিগারেট ধরালাম। "নে সিগারেট খাবি?"

"না"

তৌফিক সিগারেট খায় না, তবুও যখনই আমি সিগারেট ধরাই তখনই ওকে অফার করি। ও যথারীতি প্রত্যাখ্যান করে। ধুমপানের সময় পাশে কেউ থাকলে অফার করা ভদ্রতা। এটা আমাদের কালচারের অংশ। তৌফিক ধুমপান করে না, প্রত্যাখ্যান করে।

তৌফিক আমার বাল্যবন্ধু। হাইস্কুল লাইফ থেকে দু'জন একসাথে এক স্কুলে লেখা পড়া করেছি। মাঝখানে দু'জন দুই কলেজে পড়লেও এখন একই কলেজে পড়ি। আমাদের সাবজেক্ট আলাদা। ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে, আমি বাংলাতে।

তৌফিকের সিগারেট না খাওয়ার পিছনে একটা ইতিহাস আছে। ওদের পরিবার এলাকার খুব প্রভাবশালী এবং পলিটিকস-এর সাথে সক্রিয় ভাবে জড়িত। ওর বাপ-চাচারা একেক জন একেক দল করে। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, ওদের প্রভাব থাকে। যাকে বলে ব্যালান্স রাজনীতি। রাজনীতির কারনে তৌফিকের বাপ-চাচাদের এলাকার জনগনের সাথে ব্যাপক ভাবে মিশতে হয়। আর জনগনের সাথে মেশার প্রথম স্টেজই যেন সিগারেট। এটাও আমাদের কালচারেরই একটা অংশ। ফলে তৌফিকের বাপ চাচারা সবাই ধুমপান করে। তৌফিক করে না। ওর মেঝ চাচা লিমনের করুন পরিনতি দেখে তৌফিক ভুলেও ধুমপান সামগ্রী ছুয়েও দেখে না। ওর মেঝ চাচা এক সময় এলাকার হিরো ছিলো। সে এক সময় বিড়ি- সিগারেট খেত। পরে হেরোইন খেতো।
বর্তমান হেরোইন সেবন করে করে রাস্তার পাগলে পরিণত হয়েছে। চাচার এই করুন পরিনতি দেখে তৌফিক বিড়ি-সিগারেটের নাম মুখেও নিতে চায়না, কিন্তু আমি ছাড়তে পারি না। সিগারেট আমার নিত্য সঙ্গী। এ না হলে আমি চলতে পারিনা। আর তাছাড়া, একা থাকার সময় যখন টেনশন হয়, তখন দারুন বন্ধুর কাজ করে। এই ভালোবন্ধুকে বিকল্প না পেয়ে কি ভাবে ত্যাগ করি?ক্লাস থ্রি  থেকে ধুমপানের অভ্যেস ভিতরে ঢুকে গেছে। তবে আজো সিগারেটের ভিতর সীমাবদ্ধ আছে। অন্য কোন নেশাদ্রব্য ছুয়েও দেখিনি, দেখার ইচ্ছেও নেই।

আজ তৌফিক পরেছে ব্লু কালার-এর প্যান্ট এবং হোয়াইট কালারের শার্ট। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এসেও তৌফিক ওর স্কুল কলেজের পোশাকি স্টাইল ত্যাগ করতে পারেনি। কলেজ লাইফে ক্যানটনমেন্ট কলেজে পড়েছে তো। মগজটা রীতিমত ধোলায় হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের পোষা পাখির মত অবস্থা। খাচার দুয়ার খুলে দিলেও আর মুক্ত আকাশে ফিরতে চায় না। খাচাটাই তাকে স্বাধীনতার সুখ দেয়। 



আমি পরেছি জিন্সের প্যান্ট, চামড়ার চটি,  কলার ওয়ালা ক্রীম কালারের গেন্জি। এই ধরণের পোশাক পরতে আমার ভালো লাগে। বিশেষ করে হাফ হাতা  গেন্জি, জিন্সের প্যান্ট আর পাতলা চটি পায়ে থাকলে মনে হয় উড়ছি। খুব  হালকা হালকা লাগে।
 
দু'জন হাটতে হাটতে ক্যাম্পাসের ভিড়ের স্রোত ঠেলতে ঠেলতে অবশেষে তিন তলায় আমার বাংলা ডিপাটমেন্টে পৌঁছে গেলাম। ১১৫ নম্বর রুমে অনেক ছেলে-মেয়ে বসে বসে ফর্ম ফিলাপ করছে।





(৩)





"আরে আঙ্কেল?"

কে আমাকে আঙ্কেল বলে ডাকে? তাকিয়ে দেখি আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় সে আমার সম্পর্কে চাচা হয়। সে প্রায় আমার সমবয়সী। সে আমাকে আঙ্কেল ডাকে, আমিও তাকে আঙ্কেল ডাকি। আঙ্কেলটি তার বোনের ফর্ম ফিলাপ করছে। মেয়েটি আমাকে দেখেই হেসে কুশল বিনিময় করল। আঙ্কেলটি আমার হাত ধরে টেনে তার বোনের পাশে বসিয়ে দিল।

"আঙ্কেল, আপনি এতক্ষন কোথায় ছিলেন? আমরা কি এসব বুঝি?"

আমি মনে মনে বললাম, "শালার পাগল, এই সামান্য ফর্মটাই যদি না বোঝ, তবে তোমার মত ছেলের মাস্টার্স পড়ে লাভ টা কী? খামোখা দেশের অর্থের অপচয়। "

আমার আঙ্কেল আবার ইতিহাসে মাস্টার্স পড়ে। অথচ দেখ তার অবস্থা। সে আবার বলতে লাগল, "আপনার হোস্টেলে গিয়ে দুই দিন বলে এসেছি। আর আপনি এখন আসছেন? নেন দেখেন পুরণ করা হয়েছে কি না?"


 আমি কিছুক্ষন ফর্ম পূরন করা বাদ দিয়ে আঙ্কেলের বোন কে পূরন করতে লাগলাম। আঙ্কেলের বোনতো আন্টি তাকে অন্য নজরে দেখা পাপ। জীবনে কত আন্টি, আপাকে দেখেছি ওয়াইফ হতে। এ এখন আন্টি, খানিক বাদে সে ডার্লিং হবেনা তার কোন নিশ্চয়তা আছে? আন্টি সম্পর্ক তো দূরের, তার উপর দূর সম্পর্কের। আর ওয়াইফ হলে তো আর কোন দূরই থাকে না। এর চেয়ে নিকটতম আর কেউ হয় নাকি? অতএব অন্য চোখে
দেখলে পাপ হবে কেন? সওয়াবই তো হওয়ার কথা। দূরকে নিকট করার স্পৃহার ভিতর পাপ থাকবে কেন?
সে তো পুন্যেরকাজ! আপাতত কিছু পুন্য সঞ্চয় করি, পরে কর্ম ফিলাপ করা যাবে। আমার আজ মনে হচ্ছে, এই আন্টিটিকে, ঠিক আগে যা দেখেছি, তার চেয়ে আরো অনেক সুন্দরী হয়েছে। আর যুবতী সুন্দরী মাত্রই যুবক ছেলের আপনজন। যার চেয়ে আপন আর এ বয়সে কেউ নেই। তবু এক সময় এই আপন অবলোকন বাদ দিয়ে, ফর্ম পুরনের দিকে মনোযোগ দিতে হলো।

আমি যখন আন্টিকে ফর্ম পূরণ  করছি, তৌফিক তখন গ্রামের একটি মেয়েকে হেল্প করছে। মেয়েটিকে একনজর দেখলাম। মেয়েটিও আমার দিকে এক নজর তাকালো। কি অপূর্ব সুন্দর দু'টি চোখ তার। চোখ দু'টি কালো বোরখার ফাঁকে যেন কচি সবুজ ঘাস, আকশের উপর আকাশ। আমার হৃদয় যেন শূন্য মরুভূমি। জীবনে অনেক সুন্দরী মেয়ে দেখেছি। সুন্দর চোখও কম দেখিনি। আফসোস। শরীর যেন থরথর করে কাঁপছে। বুকের মাঝে চিকন সুখের ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। কীভাবে এর সাথে পরিচিত হবো? বুকের ভিতর যখন ঝড় শুরু হয়েছে, তখন এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষন। তৌফিক ডাক দিলো, "এই তুষার এদিকে আয়।" আমি এগিয়ে গেলাম। তৌফিক বলল, "পরিচিত হ. একে চিনিস? ও হচ্ছে রাশমিন।"

  


(৪)




আমি চিনবো কি করে? একে তো আগে দেখিনি। তবু তার চোখ দুটো যে আমার কত চেনা!হাজার বছরের সাধনার ধন। আমি না চিনেও চেনার ভান করলাম।যেটা রাজনীতিবিদরা করে থাকে।

 জিজ্ঞেস করলাম," কে, রাশমিন? ভাল আছিস?"

রাশমিন,"হ্যা,আপনি ভাল আছেন ? আপনি তুষার, তাই না? "



তার কথায় আমি যেন চমকে উঠলাম। তৌফিকের এবং রাশমিনের দু'জনের বাড়িই মানিকছড়া। সে মানিকছড়ার কোন জুনিয়ার ছেলে বা মেয়ে যে, শুধুমাত্র আমার নাম ধরে  ডাকতে পারে -এ আমার কল্পনার বাইরে ছিলো এত দিন। তারা আমার নামের সাথে ভাই, কাকা ইত্যাদি জুড়ে  দেয়।কিন্তু একি! বিস্ময়ের ধাঁক্কা কাটতে না কাটতে রাশমিন আবার বললো, "আপনি আমাকে তুই  বললেন কেন? এটা আমি পছন্দ করি না।"

তার সাহস, তার সরলতা, তার তীর্যক কথাবার্তা  আমাকে অভিভূত করে ফেললো। এতদিন আমি জানতাম রাশমিনের গ্রামের সব জুনিয়ররা আমার ভক্ত। তারা আমার সামনে ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলে।এতো দেখছি সম্পূর্ণ  উল্টো। 

আমি তাদের গ্রামে একসময় লজিং থাকতাম। তাদের গ্রামে একসময় কত নাটক লিখে মঞ্চে  তুলেছি। এতদিন আমি জানতাম মানিকছড়ার সবাই আমার ফ্যান, আজ সেটা ভুল প্রমাণিত হতে যাচ্ছে। সম্ভবত রাশমিন আমার ফ্যান না। এমনি সিনিয়র হিসেবে, ভালো স্টুডেন্ট হিসেবে সে আমাকে সম্মান করে।

রাশমিন,"আপানি আমাকে চিনতে পেরেছেন?"

"হ্যাঁ। তোকে না চেনার কি আছে? "

রাশমিন," আমি তো বোরকা পরা। "

তার চোখে কৌতুক ভরা দুষ্টুমির ঝিলিক।



তুষার,"মানিকছড়ার যে কোন লোক সাত পর্দার ভিতর থাকলেও আমি ঠিক চিনতে পারি।তুই রাশমিন।"

রাশমিন," আপনি কিন্তু আবারো তুই, তুই  বলছেন।"

লজ্জা পেলাম। বললাম, "পুরাতন অভ্যাস তো কিছু মনে করো না।"
রাশমিন ফর্মফিলাপের দিকে মনোযোগ  দিলো। পেছনে একটি মেয়ে আমাকে ডাকছে। তার মনে হয় হেল্প দরকার।  বললাম, "কিছু  মনে করো না। আমি একটু আসছি।"

রাশমিনের চোখ দুটিতে  হাস্যোজ্জল সম্মতি। বোরকার ফাঁকে তার চোখ দুটিতে যেন বসন্তের বাতাস বয়ে গেলো। আমার মন কোকিলের মতো নেচে উঠলো। অনিচ্ছা সত্ত্বে মেয়েটিকে  হেল্প করতে  এগিয়ে যেতো হলো। এটা আমরা  প্রথার মতো   করে থাকি। সব রাজনৈতিক দল এটা করে থাকে। 

মেয়েটি এসেছে মাগুরা থেকে। এই যশোরে তার পরিচিত কেউ নেই। আর ফর্মটাও একটু জটিল। এক তথ্য দশ জায়গায় দিতে হচ্ছে।এক কথা দশ জায়গায় দশ রকম ভাবে বলা হয়েছে।আমি তাকে পর্যায়ক্রমে বুঝাতে লাগলাম।  সে ধিরে ধিরে ফিলাপ করলো। শেষে  বললো, "ভাইয়া, আপনাকে ধন্যবাদ। কী নাম আপনার? "
" তুষার।"



"বা! খুব  সুন্দর নামতো তো আপনার। মনে থাকবে আপনার কথা"

" কতজন বলে, দেখা যাবে তুমি চান্স পেয়েছো, ভর্তি হয়েছো অথচ আমকে দেখে চিনতে পারছো না। "

"এ রকম হয় না -কি?"
"হচ্ছে তো।"

"আমি অতটা অকৃতজ্ঞ মেয়ে না।"

"দেখা যাবে।"


আমি তাকে মাধুরির ঘটনাটা সংক্ষেপে বললাম। শুনে সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলো। তারপর  আমার হাত স্পর্শ করে বললো, "বিশ্বাস করেন ভাইয়া, সব মেয়ে একরকম  হয় না। "

"বিশ্বাস করলাম। "

বললাম," চলো,দেরি হয়ে যাচ্ছে।  তোমার ফর্ম জমা দিয়ে আসি। "




(৫)



কলা ভবনের নিচতলায় ফর্ম জমা দেওয়ার দু'টো কাউন্টার। কাউন্টারের সামনে ছেলে মেয়েরা পিঁপড়ের মতো সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে । একজনের শরীরের উপর আরেকজন।গুড় গাদাগাদি অবস্থা।  রোদে গরমে সবারই দমবন্ধ অবস্থা। তবু সবাই প্রাণপণে লড়ছে। 
আমার সাথের মেয়েটি বললো, "দেন ভাইয়া আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না।"

মেয়েটির কাগজপত্র আমার কাছে। তাকে বললাম, "এদের কাছে শোনো, এই রোদ গরমে এরা কত সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে?"
 

সে প্রশ্ন করে যা জানতে পারলো, তাতে কোন আশার আলো দেখতে না পেয়ে, আমার দিকে সমর্পিত দৃষ্টিতে হতাশার ব্যানার টাঙিয়ে তাকিয়ে থাকলো। বললো,



"কিন্তু এছাড়া আর কী করার আছে ?" 
বললাম, "এসো  আমার সাথে।"



যে রুমটাতে কাউন্টারের লোকজন বসে আছে, দেখি তার দরজাতেও তিল ধারণের জায়গা নাই। কিছু নেতা, পাতি নেতা, ছিঁচকে নেতা দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে ঢোকার আশায়, ঢুকতে পারছেনা। আমি গলা চড়িয়ে বললাম, "এই আজিজ, দরজা খোল।"

দরজার ওপাশ থেকে আজিজের আর্দ্র কণ্ঠ  "কে মামা?দাড়ান খুলছি।"

আমার কণ্ঠ এদের মুখস্থ।শুধু মুখস্থ না, ঠুটঁস্থ।

দরজা খোলার সাথে সাথে আমার পিছুপিছু  সবাই  ঢোকার চেষ্টা করলো। আজিজ আমাকে ছাড়া আর কাউকে  ঢুকতে দিলো না।  বললাম, "আজিজ,ঐ  মেয়েটি  আমার সাথে। সাথে সাথে আজিজ ঢুকিয়ে নিলো।



যত ভিড় সব কাউন্টারের বাইরে। ভিতরে শুনসান পরিবেশ। এদের কোন ব্যস্ততা নেই। । দিব্যি ধীরে সুস্থে কাজ করছে। কাউন্টারের ওপাশে বিক্ষুব্ধ জনসমাবেশ। আক্রোশভরা বিস্ফোরিত  চোখ। সব মিলিয়ে কাউন্টারের বাইরে  উত্তাল পরিবেশ। ভিতরে সেই উত্তাল ঢেউয়ের ছিটেফোঁটাও নেই।   আজিজ আমাদের দু'জনকে চা বিস্কুট খাওয়ালো। ফর্মটর্ম জমা দিয়ে রসিদ নিয়ে দিলো। মেয়েটি সমস্ত হাঙ্গামার হাত থেকে রক্ষা পেলো। এতে তো তার মহা খুশি হবার  কথা। হলো উল্টো। সে চলে যাবার আগ পর্যন্ত একটা কথাও বললো না। সারাক্ষণ যেন ভয়ে চুপসে থাকলো। আমি বুঝতে পারছি,সে আমার প্রভাব দেখে ভয় পেয়েছে। সে যাই হোকনা কেনো, সে আমার সাহায্য দিব্যি গ্রহণ করেছে । তা হলে এতো দ্বিধা কীসের? 




 ঘটির পানি খেয়ে ঘটির দোষ বিচার? অকৃতজ্ঞতা ছাড়া আর কি? মজার ব্যাপার দেখো।পরে তৌফিকের কাছে শুনেছি "মেয়েটি চান্স পেয়েছে। ভর্তি হয়েছে। অথচ দেখো একদিনও এসে বলেনি,ভাইয়া,কেমন আছেন?" 


 এরা আমাদের কি মনে করে?

ভয় পাও, অথচ সহযোগিতা নেওয়ার সময় স্বার্থপরের মত চুপচাপ নিতে পারো?

মেয়েটির সেই প্রায় নীরব  প্রস্থান আমাকে একটা  শুন্যতার মাঝে দাঁড় করিয়ে  দিলো। আমার  উচিৎ ছিলো তাকে  রোদের ভিতর লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। রোদের ভিতর ঘেমে নেয়ে যখন নিশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসতো তখন তাকে যদি উপকারটা করতাম সে কৃতজ্ঞতায় গলে চুর হয়ে যেতো।কিন্তু  আমার এ ভাবনাও ভুল। কই মাধুরি তো অকুল পাথারে পড়েছিলো। তাকে টেনে  তুলেছিলাম। কই সেও তো  কোনোদিন সামান্য একটু ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি। সমস্ত বিতৃষ্ণাকে ছাপিয়ে মনের পর্দায় রাশমিনের জলজ টলমল চোখ দুটি ভেসে উঠলো। এই বিরান প্রান্তরে তার চোখ দুটি যেন শ্যামল আশ্রয়। আমি সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে আবার তিনতলার  দিকে উঠতে শুরু করলাম। আসলে আমি নিজ থেকে যেন উঠছিনা। কেউ যেন উঠাচ্ছে।কী সে? কে সে? রূপ?রূপের নেশা? না। চোখের রূপ। সেই রূপের নেশা।


(৬)



 আমাকে আর বেশি দূর উঠতে হলো না । দোতলার সিঁড়ির মাথায় রাশমিনের সাথে দেখা হয়ে গেলো। তৌফিক আর রাশমিন গল্প করতে করতে নিচে
নেমে  আসছে। আমি  নিচ থেকে তার চোখ  দু'টো দেখার চেষ্টা করছি। দেখা যাচ্ছে না। সে নিচের সিড়িতে চোখ রেখে রেখে নেমে আসছে। আমার ইচ্ছেগুলো বন্দি  পাষাণ প্রাসাদে  মাথা কুটে মরছে। অবশেষে দোতলার সিড়ির মাথায় সমতল অংশে তার সাথে চোখা চোখি হলো। সে হাসলো। সে হাসি আবৃত মুখে বোঝা গেলো না। বোঝা গেলো চোখের সবুজ উদ্যানে। লাখো পাখি একসাথে  মুক্তির গান গেয়ে উঠলো। কী বলি কি না বলি। শেষে মুখ থেকে কিছুই বের হলো না। অথচ কতো কথারা  মনের ভিতর মিছিল করছে। নীরবতার ছেদ টানলো তৌফিক, "চল, নিচে। ফর্ম জমা দিয়ে আসি।"

বললাম, "চল।"



 পরক্ষনেই সিদ্ধান্ত বদল করলাম।এক অজানা ভয় পেয়ে বসেছে। আমার ভিতর একটা চাওয়া মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে প্রবল প্রতাপে।  তাকে এখনি থামিয়ে দিতে  হবে, নাহলে   নষ্টের নাগালে আমাকে তছনছ হতে হবে।যদি ঐ রূপের নেশায়  আসক্ত হয়ে পড়ি? তারপর  চাওয়া পাওয়ার হিসেব যদি না মেলে?। তখন, ? আমি নিজেকে কড়া ব্রেকে থামিয়ে দিলাম।যাদের উপকার করেছি,যাদের জন্য খেটেছি তারাই আমাকে সাথে সাথে ভুলে গেছে। আর একে তো একপ্রকার এড়িয়েই গিয়েছি।সুতরাং তাকে নিয়ে ভবিষ্যতের কোনো ভাবনা ভাবা বোকামী ছাড়া আর কিছু না।আমি পিছিয়ে এলাম।অন্য একটা কাজের অজুহাতে  তাদের ছেড়ে দিলাম।




তাকে ভুলতে চেষ্টা করলাম।রাশমিন আর তৌফিক সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলো।





(৭)




আমি বাংলা ডিপার্টমেন্টে  ফিরে এলাম। মন ছটফট করছে। ইচ্ছে হচ্ছে রাশমিনকে খুজে বের করি। তার সান্নিধ্যে যাই। ভালো লাগবে। আবার নিচে এলাম।ক্যান্টিনে ঢুকে সিগারেট  ধরালামা।হঠাৎ  শ্লোগানে  শ্লোগানে ক্যাম্পাসটা কেঁপে কেঁপে উঠল।  দ্রুত সিগারেট শেষ করে  মিছিলে যোগ দিলাম।  মিছিলোত্তর সমাবেশ এবং বক্তৃতা হলো।সমাবেশে  কেন্দ্রীয় নেতা আবির ভাই এবং রশিদ  ভাইয়ের হত্যার প্রতিবাদে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হলো। এর পরই শুরু হলো দাতাল করিমের জ্বালাময়ী  বক্তৃতা। জ্বালা তার বক্তৃতা বর্ষণের জন্য না,  উচু দাঁত খিচিয়ে বিচিত্রভাবে মুখ বিকৃতি করার জন্য। 



করিম ক্যাম্পাসের সভাপতি। বক্তৃতা দেওয়ার সময় তার সামনের দু'টো বড়বড় দাঁত  এন্টিনার মত দুই দিকে প্রসারিত হয়ে পড়ে। তার এই বিখ্যাত দাঁত দুটোর জন্যই সবাই তাকে দাঁতাল করিম নামে ভূষিত করেছে। প্রকাশ্যে নয়,  আড়ালে আবডালে । প্রোগ্রাম শেষ।বসে আছি  কদম তলার টেন্ডে। 

জুমন ভাই কড়া মেজাজে জানতে চাইলো,মিছিলে যেতে দেরি হলো কেন? 

অনেক কিছু ইনিয়ে বিনিয়ে বলে কাটিয়ে দিলাম।

 জুমন ভাই  আমাদের জেলা সভাপতি। সে চায় আমি যেনো সবসময় সামনে সামনে থাকি।আগামীতে গুরুত্বপূর্ণ   দায়িত্ব নেওয়ার মত করে তিনি আমাকে গড়ে তুলতে চান। কিন্তু দাঁতাল করিম বিরোধিতা করে। তার পছন্দের ব্যক্তি  শাহিন।শাহিনও আমার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে। করিম, আমি, শাহিন আমরাএকই হলে থাকি।




 হলে করিমের সমর্থক বেশি। জুমন ভাই বাইরে থাকে।হলে তার সমর্থক কম। সে দিক দিয়ে আমার এন্টি  গ্রুপ সুবিধাজনক পজিশনে আছে। । এই অবস্থায়  প্রোগ্রামে কোনোরকম  শৈথিল্য অবনতির লক্ষণ।

হলে ফিরে দুপুরের খাবার ঠিকমতো খেতে  পারলাম না।  ঐ চোখ দুটি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। এ যেনো চোরাবালি। যতোই বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি ততোই তলিয়ে যাচ্ছি। দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে ফিরে এলাম, সময় কাটতে চায় না। সিগারেট ফুঁকে ফুঁকে রুমটা  ধোয়া ধোয়া করে ফেললাম। ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। চিৎকার চেচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেলো। শহরের ভিতর প্রোগ্রাম আছে। এখনি মিছিল নিয়ে বের হতে হবে। কি আর করা, তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
 

স্লোগান মুখর মিছিলের ভিতর ও বার বার সেই চোখ দুটো মনের পর্দায় ভেসে ভেসে উঠতে লাগালো। আমি মিছিল থেকে  এক ফাঁকে বেরিয়ে দড়াটানা  ব্রীজে এসে বসলাম।অবসরের বন্ধু সিগারেট, তাকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে সময় কাটাচ্ছি।  সময় যেন আসাড় জং ধরা  ভারি গাড়ি।সে কিছুতেই নড়ছে না। চোখের সামনে দিয়ে মানুষ, রিক্সা , ভ্যান মটরসাইকেল - গাড়ির স্রোত বয়ে যাচ্ছে।  আমি দেখেও দেখছিনা।শুনেও শুনছি না।চোখ জুড়ে  চোখের মেলা। বোরকার  ফাঁকে দুটো চোখ, জলজ চঞ্চল। কখন কবে আবার দেখা হবে? বারবার মন চাচ্ছে মানিকছড়া চলে যাই। রাশমিনকে একনজর দেখে আসি।মানিকছড়া গেলেই দেখা হবে। মানিকছড়া যশোর শহর থেকে বেশি দূরে না।মাত্র ত্রিশ টাকার রাস্তা। 


মাত্র ১০ মিনিট লাগবে।  আর মানিকছড়ার প্রতিটি লোকই তো আমার সুপরিচিত। সুতরাং যাওয়া কোন সমস্যা না। কিন্তু ব্যাপার হল, সেখানে আমি বেশ কয়েক বছর যাই না। এখন এই সন্ধ্যারাতে হঠাৎ হাজির হলে সবাই কি ভাববে? ভাবছি। কোন কুল কিনারা করতে পারছিনা। ধুর, এত ভাবতে গেলে কিছুই হবে না। ঝট করে রেলিং থেকে নেমে পড়লাম। আর কোন ভাবনা নয়। এখন শুধু মানিকছড়ার পথে চলে যাওয়া। সামনে হঠাৎ কোথা থেকে তৌফিক  এসে হাজির হলো। তার মুখে সেই চির পরিচিত কেবলা ক্লাস মার্কা হাসি। এখন সে পরে আছে সাদা রং এর একটা গেঞ্জি। বুকের মাঝ বরাবর একজন রেসলারের পেশি বহুল শরীর। তৌফিককে ঐরকম শুধুমাত্র জাংগিয়া পরা অবস্থায় একদিন দেখতে হবে ওই রেসলারের মতো  দেখা যায় কিনা। 





(৮)
তৌফিকের স্বপ্ন, রেসলার না হতে পারলেও ঐরকম একটা  শরীর  তৈরি করা। অবশ্য  জন্মসূত্রেই ওর শরীরটা রেসলার টাইপ। তৌফিক বলল, "কিরে তুই এখানে? তোদের না মিছিল চলছে? "
"আরে রাখ তোর মিছিল।"

 রাশমিনের  কথাটা কি ভাবে তুলি?  ইতস্তত  করতে করতে বললাম,  "তারপর খবর কী বল? ফর্মটর্ম জমা দিতে পেরেছিস? "
"না সমস্যা হয়নি। "
 "রাশমিন  চলে গেছে? "
"না, আছে । "
"কোথায়? "
"তোর মাথায়। "
"ফাজলামো রাখ।"
"হ্যাঁ, ও তিনটার ট্রেনে চলে গেছে। "


আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। তৌফিক বলে কী? যশোর থেকে মানিকছড়া এইটুকু পথ ট্রেনে যাবে  কেন? তাছাড়া মানিকছড়া কোন ট্রেন স্টেশন নেই,।
"কি বললি তোর মাথা টাথা ঠিক আছে? মানিকছড়া ট্রেনে যাবে কেন? "

তৌফিক হোহো করে হেসে উঠে বলল," এই শালার ছাগল। মানিকছড়া ট্রেনে যাবে কেন? ওতো গেছে খুলনায়।"
" কেন খুলনায় কেন?"
"আরে, আরে ও তো ওর খালু  বাড়ি খুলনায়  থেকে লেখাপড়া করে, এইজন্যে ওকে তুই চিনিস না।"

 এতক্ষণে আমি বুঝলাম,  কেন ও মানিকছড়ায় বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও আমি ওকে চিনি না। 



তৌফিক আবার বলতে শুরু করলো,রাশমিন প্রথমবার ইন্টারমিডিয়েটে খুব বেশি  ভালো করতে পারেনি। তাই এইবার আবার ইমপ্রুভমেন্ট দিচ্ছে। সেই জন্যই খুলনায় গেছে। 

আমার আশার গুড়ে বালি। কিন্তু আমার যে অবস্থা বালিওয়ালা গুড়ও কোন সমস্যা না। যত বাধাই থাক না কেন রাশমিন যদি মানিকছড়া থাকতো আমি যেতামই। এবং দেখা করতাম। এখন দেখছি গুড়ে বালি তো দূরের কথা গুড়ই তো নেই। 

জানিনা আর কখনো দেখা হবে কিনা। হতাশায় মনটা ভরে গেল। তখন কলেজে যদি তাকে সময় দিতাম। ইচ্ছে করছে মাথার চুল গুলি বসে বসে টেনে টেনে ছিঁড়ি। আপাতত আর কোন উপায় নেই। 




(৯)




আমার অকৃত্রিম বন্ধু সিগারেট। তাকে স্মরণ করতে হলো। ব্রিজের রেলিংয়ে বসে বসে ধোয়া  তৈরি করা ছাড়া এখন আর আমার কোন কাজ নেই। সমস্ত পৃথিবীতে এখন এই আমার প্রধান কাজ। সিগারেট টেনে টেনে ক্লান্ত হয়ে প্রায় দশটার দিকে ব্রিজ থেকে নামলাম। ব্যস্ত দড়াটানার জনস্রোত এখন কিছুটা থিতিয়ে  এসেছে।হাটা  শুরু করলাম। কালেক্ট্রি ভবনের নিচে আবছা অন্ধকার। বিশাল ভবনের উত্তরে ছোট্ট উদ্যান। সেখানে রাতের বধূরা রসের মেলা বসিয়েছে। স্ত্রী পুরুষের দর কষাকষির হালকা কথাবার্তা কানে ভেসে ভেসে আসছে। কত সস্তায় এখানে ভালোবাসা বিক্রি হচ্ছে। কেবল বাঁশ পটি পার হয়েছি। অপর পাশের ঘন অন্ধকার থেকে হাত নেড়ে ইশারায় একটা মেয়ে আমাকে কাছে ডাকছে।

সে বোধ হয় একটাও খদ্দের পায়নি। তার জন্যও মায়া হল। লাজ লজ্জাহীন মেয়ে আর্দ্র  গলায় বলছে, ওই মিয়া লাগলে আসেন। 


সিগারেট টানতে টানতে দ্রুত প্রস্থান করলাম। 


সেই রাতেই। আমাকে হলের ছাদে ডাকা হল। হলের ছাদ হল অপরাধী ছাত্রের জন্য রিমান্ডের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। আজ আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হবে। প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। হল কমিটির দুই নেতা দরজা ধাক্কাধাক্কি করে   জাগালো। তাদের চোখে মুখে আগুন ঝরে পড়ছে। যেন ওরা হুলো বেড়াল আর আমি নেংটি ইঁদুর। এখনই ঘাড় মটকে দেবে। আমি খুব বেশি পাত্তা দিলাম না। 


জানিয়ে দিলাম পরে আসছি। ওরা চলে গেল। ভাবতে শুরু করলাম। কি করা যায়? এখন হলের অধিকাংশ ছাত্রই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার যারা দু-একজন আছে তারাও কে কোথায় আছে, হয়তো  ঘুমিয়ে পড়েছে।এই সুযোগে করিম তার ক্যাডার  বাহিনী দিয়ে আমাকে পেটাবে। ছাদে মোটা মোটা জ্বালানি কাঠ রয়েছে। যারা পেটাবে তারা নেশা করে তৈরি হয়ে বসে আছে। আমি ছাদে উঠবো দু চার কথা বলার পর হঠাৎ শুরু হবে মার। কারণ হিসেবে হাজির করা হবে, আজ মিছিল থেকে বেরিয়ে আসা, কলেজ ক্যাম্পাসে দেরিতে মিছিলে যোগ দেওয়া। মিছিলে যোগ দিয়ে স্লোগান  না দিয়ে চুপচাপ হাটা।করিম তার টিকটিকি শাহীনকে সব সময় আমার পিছনে লাগিয়ে রাখে। হয়তো আমার অজানা আরো কোন দোষ হাজির করা হবে। কি কি তার মনে আছে সেই ভালো জানে। 




এই মুহূর্তে হল কমিটিতে আমার পক্ষে  কথা বলার মত কেউ নেই। পরের টার্মে হয়তো আমিই হলের সভাপতি হব, সেই ব্যবস্থা  জুমন ভাই করে দেবে। কিন্তু আজ বাঁচাবার কেউ নেই। করিম জুমন ভাইয়ের এন্টি গ্রুপ করে, আমি ভয়ে ঘামতে  শুরু করেছি। সিগারেট ধরিয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা শুরু করলাম। দরজায় আবার ধাক্কাধাক্কি শুরু হলো। এবার মনে হচ্ছে দরজা ভেঙে ফেলবে। আজ কপালের মার কেউ বাঁচাতে পারবে না। কোনো বুদ্ধি আসছে না। দ্রুত সিগারেট টানছি।ইতিপূর্বে ছাদের মা'র খেয়ে কয়েকজন হাত-পা ভেঙে হল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। আমার কপালে তাই লেখা আছে না-কি? তাহলে দাঁতাল করিম আজ আমার উপর চরম প্রতিশোধ নেবে?তার বিরোধিতার প্রতিশোধ? 


মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো। শেষ চেষ্টা হিসেবে এটাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। যত যাই হোক জুমন ভাই জেলা সভাপতি। আর করিম শুধু মাত্র একটি হলের। দেখি তার দোহাই দিয়ে। বললাম, "আমি এখন ছাদে যেতে পারবো না। শরীরটা খুব খারাপ।"

 এতে তারা রেগে আরও দ্বিগুণজোরে দরজা ধাক্কাতে লাগলো। বললাম, "জুমন ভাইয়ের সাথে কথা হয়েছে। সকাল বেলায় জুমন ভাই এসে করিম ভাইয়ের সাথে কথা বলবে। "


কথায় কাজ হলো। যেন জ্বলন্ত আগুনে পানি পড়েছে। সব চুপসে গেছে। টু শব্দটি না করে ধীরে ধীরে ওরা চলে গেল। 



বেচারা দাঁতাল করিম। আমি এখন যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, দাঁতাল করিম ছাদে বসে আছে। পাশে তার ক্যাডাররা। প্রত্যেকের হাতে লাঠি। আমাকে না মারতে পেরে করিম হতাশ। তার মুখ হাঁ হয়ে গেছে। সামনের বড় দাঁত দুটো শুড়ের মতো বেরিয়ে এসেছে।দাঁতে বাতাস লেগে লেগে শুকিয়ে যাচ্ছে। করিম শুকনো দাঁত  বারবার জিভ দিয়ে  ভেজাবার চেষ্টা করছে। ক্লান্তিতে তার সাগরেদরা ঝিমাতে  শুরু করেছে। করিম দাঁত বের করে হতাশ হয়ে বসে আছে। মাথার ওপর তার চাঁদহীন  রাতের ফাঁকা খোলা আকাশ। 





(১০)



ভেবেছিলাম রাশমিনের  সাথে এ জীবনে আর দেখা হবে না। দেখা হলেও কথা হবে না। হয়তো সে আমাকে এড়িয়ে যাবে। কপাল ভালো বলতে হবে, ভালো না মহা ভালো। পরীক্ষার দিন দেখা হয়ে গেল। কি সৌভাগ্য ! 


সেই হাসি হাসি চোখ, হাজারো কথার ছুটোছুটি, চঞ্চল স্থিরতা। দাঁড়িয়ে আছি আব্দুল হাই কলা ভবনের সামনে। পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা দিয়ে বের হতে শুরু করেছে। পরীক্ষার্থীদের আমি সুনিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছি।  দোতলা তিনতলার দিকে নজর বুলিয়ে নিয়ে গেটের দিকে নজর রাখছি।সবার প্রতি দৃষ্টি দিচ্ছি না। দিচ্ছি শুধু বোরকা ওয়ালীদের দিকে।  এ এক মহাযজ্ঞ। ১০০ জন মেয়ের ভিতর ৯০ জন মেয়েই বোরকা পরা। 


হঠাৎ দেশে  বোরকার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে গেছে। এখন নিজের বউ পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও কেউ ভালো করে খেয়াল না করলে চিনতে পারবে না। পুরুষের জন্য অসুবিধা হলেও মেয়েদের জন্য খুব সুবিধা হয়েছে। কিছু করার জন্য বোরকা খুবই নিরাপদ গোপন নিরাপদ আশ্রয়। এত বোরকার আড়ালে কোথায় যে রাশমিন আছে খুঁজে বের  করা মুশকিল। তবে একটা সুবিধা আছে। সব রঙের বোরকা পর্যবেক্ষণ করছি না।। শুধু কালো রঙের বোরকা পর্যবেক্ষণ করছি। অবশ্য  কালো রঙের বোরকার সংখ্যায় বেশি। আমার স্পষ্ট মনে আছে, রাশমিন কালো রঙের বোরকা পরেছিল  সেদিন। সেদিন কালো রঙের বোরকা পরেছিল বলে যে আজও কালো রঙের বোরকা পরবে তার কোন মানে নেই। 



তবুও আমার বিশ্বাস কালো রঙের  বোরকাতেই আমার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি মিলবে।কালো রঙের   বোরকা যদি সে পরে থাকে তাহলে হাজার বোরকার ভিড়েও আমি তাকে চিনে নেব। তার বোরকা  গেঞ্জির কাপড়ের তৈরি।সবকিছু স্মৃতিপটে   নিখুঁতভাবে গেঁথে নিয়েছি।তার হাঁটার প্রতিটি ছন্দ আমার এক দেখায় মুখস্ত হয়ে গেছে।   রাশমিন হাটলে হাঁটার সময় তার বাম কোমরে মাঝে মাঝে একটু ভাজ পড়ে। বোরকার টানটা  থাকে বাম কোমরের দিকে। কিছুই  ভুলিনি আমি। 

সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পায়ে ব্যাথা হয়ে গেছে।কত মেয়ে  সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল।কোথাও ভুল  হয়নি তো আমার?মনের ভিতর সন্দেহ  মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। 



ধৈর্যরাও বিদ্রোহ শুরু করেছে।হতাশা গ্রাস করতে চাচ্ছে। কিন্তু হেরে গেলে তো হবে না। তবু কোথায় সে?হয়তো সে  পরীক্ষা দিতে আসেনি।এমনি  জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ফরম তুলেছে।তার  এসএসসির রেজাল্ট খুবই ভালো।হয়তো  ইন্টারের ইমপ্রুভ নিয়ে ব্যস্ত আছে।সাইন্স  গ্রুপের তো অনেক ঝামেলা। প্রাকটিক্যাল ট্যাল  আছে। সেতো  খুবই ভালো ছাত্রী।এসএসসি   পর্যন্ত সমস্ত ক্লাসের সে ফার্স্ট ছিল। এতো ভালো ছাত্রী জাতীয়  বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা না দেওয়াটাই খুব স্বাভাবিক। এখানে পরীক্ষা দিতে আসাটাই তো অস্বাভাবিক। হয়তো  কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চান্স হয়ে গেছে। আজ যে এখানে পরীক্ষা আছে সে কথা হয়তো সেই ভুলেই গেছে। 


অথবা যদি সে এসেও থাকে পরীক্ষা দিয়ে হয়তো কোন ফাঁকে   বেরিয়ে গেছে। হাজারো হয়তো মনের মাঝে সন্দেহের   ডালপালা মেলে আমাকে ভেঙে চুরে, চুরে ভেঙে   গুঁড়ো গুঁড়ো করছে। মন দোলনার মত দুলছে। আর চুরচুর করে ঝরে যাচ্ছে। তবু ক্ষীণ  আশায় বুক বেঁধে অবিচলতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। যদি কোন ক্রমে দেখা হয়ে যায়। খড়ের গাদা থেকে সূচ খুঁজে বের করার মত অবস্থা।  হাজার হাজার ছেলেমেয়ে গেট দিয়ে স্রোতের মতো বের হয়ে যাচ্ছে। গেটের মুখে বটের ঝুরির মতো জটলা।তবু  দেখা যাক। যদি দেখা হয়।আর কিছু  নয় শুধু দেখা। এক পলক। হঠাৎ ঘাড়ে একটা থাপ্পড় পড়লো। তাকিয়ে দেখি, তৌফিক। 


তৌফিক,"কিরে  এত ডাকছি, বধির  হয়েছিস,  না বোবা?"


তুষার, "  বোবাও নয়, বধিরও নয়- বিটপি। বুঝলি? গাছ।তুই আবার কখন ডাকলি? "


তৌফিক, " কমছে কম  ১০০০ ডাক দিয়েছি।  স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছিস।কি চিন্তা করছিলি  বল?"


 তুষার," আরে না।  এমনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুলবাগান দেখছি। কলা ভবনের নিচে কত ফুল ফুটেছে দেখ। "


তৌফিক, "আগুনের ভিতর দাঁড়িয়ে কেউ গোলাপ ফুল দেখেনা। সর্ষেফুল দেখে। তুই কোনটা দেখছিস?" 


তুষার, " আমি সর্ষে দেখছি না, সর্ষের ফুলও দেখছি না। দেখছি গোবর। "

 তৌফিক, "কোথায়? "

তুষার, "তোর মাথায়। "

তৌফিক, " পাগলরা কত কিছু দেখে।তোর কপালে  দুঃখ আছে। শালা। "


কথা বলতে বলতে তৌফিক দাঁড়িয়ে থাকা রিক্সায় গিয়ে উঠলো।রিকশায়  শুধু সে  একা নয়। আগে থেকেই তার বান্ধবী জনা  বুক ফুলিয়ে বসে আছে। 


তুষার, " তোর কপালে তো দেখছি সুখের সীমা নেই।" 

তৌফিক, " সে বিচার তোকে করতে হবে না।সন্ধ্যায়  দড়াটানায় আবুলের চায়ের দোকানে আয়। কথা আছে। "



জনা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।আমিও  মুচকি হেসে তার হাসির জবাব দিলাম।

ইদানিং  দেখছি তৌফিক রাত দিন জনার সাথে লেগে আছে। হোটেলে, মেসে, সর্বত্র জনা- তৌফিক। মেসে  একই লেপের তলায় তাদের মাঝে মাঝে আবিষ্কার করি। এক মাস আগেও তৌফিককে রেখার সাথে সব জায়গাতে দেখা যেত। তার আগে ছিল পপি। এখন দেখছি জনা। অবশ্য রেখা, পপি কেউ যে তৌফিকের দিকে হা করে চেয়ে বসে আছে তা নয়।তারাও  অন্যজনের গলায় ঝুলে গেছে।কে আর অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে চায়। 


 তৌফিক আর জনা চলে গেল। আমি রোদের ভেতর কারেন্টের পিলারের মতো আবার শক্ত অবস্থান নিলাম। 






(১১)




প্রায় সব  পরীক্ষার্থী নেমে এসেছে।

আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি।আজ  আর দেখা হলো না। বাদাম ওয়ালার  সাথে ১০০ গ্রাম বাদাম কেনার জন্য দর কষাকষি শুরু করেছি।পাশ থেকে  একটি মেয়েলি কন্ঠ আমাকে আহবান করল," তুষার ভাই। "

আমি চমকে  উঠলাম। এ যে বহুল  প্রত্যাশিত সেই আহ্বান। এযে স্বয়ং রাশমিনের কণ্ঠস্বর। বোরকার ফাঁকে সেই চোখ।তাকিয়ে দেখি বোরখার ফাঁকে সেই চোখ হাসছে।  হাজারো কথার প্রাণ চোখ দুটিতে ছোটা ছুটি করছে।


যাকে  দেখার জন্য, যার সাথে কথা বলার জন্য-  এত দীর্ঘ সময় এত কষ্ট স্বীকার করলাম, দ্বিধাদ্বন্দ্বের চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে প্রত্যাশা পূরণের উর্বর  সমভূমিতে এসে সমস্ত ফসলের বীজ  যেন আমার হারিয়ে গেছে।অথচ  এইতো উপযুক্ত সময়। দেরি হলে জো চলে যাবে। এখনই কথার খই ফোটাতে হবে। অথচ আমি নির্বাক এক মূর্তি।  কোনরকম উচ্চারণ করলাম, " রাশমিন কেমন আছো? পরীক্ষা কেমন হয়েছে? "

কথাগুলো বলেই বুকের ভেতর ধড়ফড় করতে লাগলো। 

রাশমিন, "ভালো। "

সংক্ষিপ্ত অথচ কত মোলায়েম সুরেলা মিষ্টি উচ্চারণ। 


এরপর আমি আর কি বলি?কথারা যেন  কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া আসামি।  তাদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পেলাম, "তৌফিককে খুঁজছ? এইতো সে এখানে ছিল, এইমাত্র -দাঁড়াও দেখছি। "


রাশমিন,"আমি আপনাকে খুঁজছি।"


 "আমাকে?"

   আমি যেন গাছ থেকে না আকাশ থেকে পড়লাম। এই তিলোত্তমার আমার মত শত ছিন্নের কাছে  কী প্রয়োজন থাকতে পারে? তাও আবার দ্বিতীয়বার?  প্রথমবারেই যদি সে আমার রাজনৈতিক  পরিচয়টা পেয়ে থাকে , তবে দ্বিতীয়বার দেখা করতে আসার কথা না। এতটা আমি আশা করিনি।  আমার দৌড়   ছিল বড়জোর দেখা  এবং চোখাচোখি। দূর থেকে রূপের  সুধা পান করে পরিতৃপ্ত হওয়া।  ব্যাস, এ পর্যন্তই। কিন্তু এ যে দেখছি ধ্রুব সত্যের গালে চপেটাঘাত। সে আর  কাউকে নয়, আমাকেই চাই।  চাইতেও পারে।আমি নিজেকে  ভাগ্যের হাতে সঁপে  দিলাম। কথাই বলে না বাঁদরের গলায় মুক্তার হার। 

কথাটা তো আর এমনি এমনি আসেনি ঠিক এইরকমই কোন পরিস্থিতি থেকেই এসেছে। যাক মালা  যখন নিজেই এখন কন্ঠে আসতে চায় তবে কণ্ঠের আর দোষ কি?  কি আকাশ,  কি আকাশ কুসুম কল্পনা। 

এখন আমার দুহাত ভরা বাদাম। বললাম, " বাদাম খাও। "

"আমি বাদাম খাই না। "

প্রথম প্রস্তাব এবং প্রত্যাখ্যান। মনের জোয়ারে কিছুটা ভাটার টান পড়লো।  সে আমাকে খুঁজছে অথচ এড়িয়েও যাচ্ছে। কি দরকার এতসব ভেবে। এমনও তো হতে পারে, রাশমিন  বাদাম খায় না। তাছাড়া সেতো বোরকা পরা।বাদাম  খেতে হলে মুখের  বোরকা সরাতে হবে। সম্ভবত সে এই ঝামেলায় যেতে চাচ্ছে না। যত যাই হোক না কেন সে তো আমাকেই খুঁজছে। 

বললাম, "কিছু বলবে? "
"একটু বসব।"
"চলো। "

আমি চাচ্ছি ক্যাম্পাসের পুরাতন সাইন্স বিল্ডিং এর পেছনে বসতে। ওখানে পরিবেশটা বেশ মনোরম। বিল্ডিং এর পেছনে একটা সুন্দর সবুজ বাগান।  তারপর পুকুরের টলটলে পানি।  ওপারে আমাদের হোস্টেল। দারুন একটা পরিবেশ। রোমিও জুলিয়েটরা  সব জোড়ায় জোড়ায় এখানে বসে। এই হতভাগার কপালে কখনো রোমিও হওয়া হয়ে ওঠেনি। সায়েন্স বিল্ডিং  এর পেছনে বসেছি কোন রাজনৈতিক আড্ডায়,  গ্রুপিং এর তুমুল  আলোচনায়, কোথাও কোন কমিটি গঠন করতে হবে,  অথবা প্রতিপক্ষের কর্মকাণ্ডের উপর সমালোচনার তুমুল ঝড় বয়ে দিতে। কিন্তু  নরম সুরে কোমল কথাগুলি একটি একটি পাপড়ি মেলে বিকশিত  হবার সুযোগ কখনো পায়নি। কেন জানিনা এমন হয়।আজ বুঝি  ব্যতিক্রম কিছু হতে চলেছে। 

রাশমিন বলল," চলেন ওইখানে বসি।"

সে আমার দলীয় টেন্টকে নির্দেশ করলো। এতে আমার মনটা শুধু মরেই গেল না কাফন মোড়া হয়ে কবরে নেমে গেল। যাক  তবু মন্দের ভালো। এই ভালো এবং মন্দের মাঝে মন্দটাই  সর্বাধিক।
 বিপদের আশঙ্কা আছে।দলীয় টেন্টে  যাওয়া মানে,  আমার দলীয়  পরিচয় উন্মোচিত হওয়া। দলীয় পরিচয় উন্মোচিত হওয়া মানে, সবকিছু অংকুরেই বিনষ্ট হওয়া। আমার  মনের ভেতর কেবল হতাশা  তার ফ্যাকাসে রূপ প্রকট  থেকে প্রকটতর করে তুলছে।  যেটুকু মেশার সুযোগ পেলাম তা আজই হয়তো শেষ হয়ে যাবে।প্রেম ভালোবাসা সে তো সুদূর পরাহত। 

রাশমিন তার ফাইল খুলে, কার্ড বের করে আমাকে বলল,"রোল নম্বরটা লিখে নেন।"

 যেন হুকুম। আমিও পকেট থেকে নোটবুক বের করে রোল   নম্বর লিখলাম। বললাম,  "আইসক্রিম খাবে?" 


রাশমিন , "আপনি এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? "

" না এমনি। কেন বাদামের মত আইসক্রিমও খাও না নাকি? "

রাশমিন,   "নেন খাতা বের করেন।"

সে মোবাইল নম্বর বলছে, আমি লিখছি। এর মাঝে আমার এলাকার তিনটি ছেলে এসে হাজির হলো।  আমি ভয়ে প্রমাদ গুনলাম।  এরা নিশ্চয়ই ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে এবং চান্স  না পাওয়ার সম্ভাবনা ১০০ ভাগ।  তাই আগেভাগেই যোগাযোগ করার জন্য এসেছে। কোন দুই নম্বর লাইন করা যায় কিনা। যা ভাবছি তাই, একটা ছেলে খুব কাছে এসে আস্তে আস্তে বলল,"ভাই,  পরীক্ষা দিয়েছি ব্যবস্থা করে দিতে হবে। "


আমি আস্তে করে বললাম, ঠিক আছে।  কিন্তু এখন না। পরে এক সময় হলে এসো। কথা বলা যাবে। 


খুব শক্ত এবং কর্কশ ভাবে বললাম । যেনো আপাতত আর কোন কথা বলার সুযোগ না পায়। তারা চলে গেল আমি একটু  ফ্যাকাসে ভাবে রাশমিনের দিকে তাকালাম। তার দৃষ্টি দেখে কিছু বোঝা গেল না। আমি আবারও একটু হাসার চেষ্টা করে স্বাভাবিক হবার  চেষ্টা করলাম।রাশমিন বলতে লাগলো, আমার এখনো প্র্যাকটিক্যাল বাকি বুঝলেন? যদি এর মাঝে রেজাল্ট দেয়, এই নাম্বারে একটু জানাবেন, পরে এসে আপনার মোবাইল বিল দিয়ে দেব। দয়া করে জানালে ভালো হয়।


রাশমিনের টেলিফোন নাম্বার   এবং মোবাইল নাম্বার এখন আমার হাতের মুঠোয়। ইচ্ছে করলে আমি তার সাথে যখন তখন  কথা বলতে পারি। 


তুষার,"রাশমিন, তুমি কি বাড়ি যাবে, না খুলনায়? "



রাশমিন," আপনার  মাথায় কিছু আছে?"

তুষার, " কেন?"

রাশমিন, " আমাদের  গ্রামে টেলিফোন আছে? আর আমার পরীক্ষা চলছে না?"

 তুষার, "ও, তাইতো। "


আমি হার মানলাম। বেশ মজা লাগছে। তার যে শুধু চোখ দুটি অপরূপ তাই না। তার  কথা বলার ভিতরেও একটা রিনিঝিনি  মিষ্টি সুর আছে। সেই রিনিঝিনি  কথা শুধু শুনতে ইচ্ছে করে। আমি বললাম,  "পরীক্ষা টরীক্ষা দিয়ে তুমি ক্লান্ত   হয়ে গেছো। এসো চটপটি খাই। "


আমরা টেন্টে বসে আছি। পাশেই চটপটি বিক্রি হচ্ছে।  তার ঘ্রাণ মাঝে মাঝে নাকে এসে লাগছে। বেশ ভালো লাগছে। কিন্তু  রাশমিন তাতে কাবু হওয়ার লোক না।  

 সে বলল, "আপনি এত খাওয়া খাওয়া করেন কেন?  খাওয়া ছাড়া আর কিছু বোঝেন না? "


তাইতো, খাওয়া ছাড়া আমি  আর কিছু বুঝিনা? আসলে তার  সাহচর্য  পেয়ে এত আহ্লাদিত হয়েছি যে, কিভাবে যে তাকে খুশি করব, ভেবে পাচ্ছিনা। আবার বেশি উচ্ছ্বাস ও প্রকাশ করতে পারছি না। শেষে সব ভেস্তে যায়। ভালোবাসা না হোক সঙ্গ, নিতান্ত সঙ্গ তো পাচ্ছি। এটাই বা কম কি? বেশি বাড়াবাড়ি করলে হয়ত আমছালা দুটোই হারাতে হবে। আমি আপাতত চুপসে যাই।


 সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "আপনিতো ক্যাম্পাসেই আছেন। কোন খবর থাকলে জানাবেন। "


সময়টা যেন বিদ্যুৎ বেগে স্যাট করে চলে গেল। পার হয়ে গেল।মাত্র ঘন্টাখানেক সে আমাকে সময় দিয়েছে।  এখনই বলছে- সে চলে যাবে। আমার মন যে কিছুতেই সায় দিচ্ছে না।মনে  মনে ফিকির খুঁজতে লাগলাম। মনে ক্ষীণ আশা নিয়ে, একটি প্রস্তাব পেশ করলামঃ 


আমি তাকে বললাম,"যদি  সাইন্স বিল্ডিং এর সামনে দিয়ে যাও তবে, অল্প রাস্তা হবে। রিক্সা না নিলেও সমস্যা নেই। আর যদি ঘুর  পথে যাও, অনেক রাস্তা।  সাধারণত তোমরা যে পথে  এসে থাকো।ভিতরের রাস্তা তোমার  চেনা আছে? "



রাশমিন," না।"


তুষার, "চলো।"


সমস্ত ক্যাম্পাস ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবকে  গমগম করছে। রাস্তায় পা ফেলার ফাঁক নেই। কত মানুষ, নতুন  নতুন চেহারা। নতুন নতুন ছাত্র-ছাত্রী। নতুন নতুন  ফ্যাশান।ছেলে - মেয়েদের উচ্ছল  চলাফেরা। ক্যাম্পাসে একটা উৎসব উৎসব পরিবেশ। ভিড়ের ভিতর দিয়ে আমরা পাশাপাশি হাঁটছি,তার শরীরে মাঝে মাঝে  আমার শরীর লেগে যাচ্ছে।কি যে ভালো লাগছে।  আমি মাঝে মাঝে তাকে দেখার চেষ্টা করছি। শুধু চোখ দুটি দেখা যাচ্ছে। আর কিছু না।

 তুষার, " তুমিতো খুলনায় থাকো। বিএল কলেজ তো কাছেই। তাই না?"

রাশমিন, "হ্যা।"


 


তুষার,"  পরিচিত কেউ আছে?  মানে নোটপাতি ম্যানেজ করা যায় কিনা। "


রাশমিন,   "হ্যাঁ, আপনি আসেন।"

 তুষার, "সে না হয় যাওয়া যাবে।কিন্তু তুমি এই দুপুর বেলা চলে যাচ্ছ। আমার হলে চলো খেয়েদেয়ে ধীরেসুস্থে  যেতে  পারবে। "
রাশমিন, "আজ না অন্য একদিন। "



আমি খুব হতাশ হয়ে গেলাম। এ শুধু পিছলে পিছলে যাচ্ছে। ধরি মাছ না ছুই পানি অবস্থা  তবু শত হতাশার মাঝে ও আশার ক্ষীণ আলো মিটিমিটি জ্বলছে। এখনো সঙ্গ পাচ্ছি,  অন্ততঃ  আরো কিছুক্ষণ তো  পাওয়া যাবে। এইভাবে পথ চেনাতে চেনাতে বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত যাওয়ার ইচ্ছে। হয়তো এই পথ চলা পথেই শেষ হবে। হোক ক্ষতি কি? 

কথা বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে গেলাম। তাকে বাসে তুলে দিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। 




(১২)




পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা থাকলে সিগারেট যে কি বিস্বাদ লাগে সে বলার না। একেবারে বিশ্রী লাগছে কিন্তু সাম্প্রতিক বিচ্ছেদ তার চেয়েও বেশি বিস্বাদ এবং যন্ত্রণাদায়ক।  সিগারেট টেনে টেনে   ক্লান্ত হয়ে পড়লাম।আর হেঁটে যাওয়া সম্ভব না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ২:৩০ বাজে।  ডাইনিংএ খাওয়ার সময় চলে যাচ্ছে। আর দেরি হলে ভাত পাওয়া যাবে না । আগে থেকেই বলে রাখলে অবশ্য ভাত  রেখে দেয়।কিন্তু তা তো বলা হয়নি। অগত্যা রিক্সা নিলাম। যে পথে আমরা দুজন হেটে এসেছি রিক্সা সেই পথ দিয়ে চলেছে।  আসলে এই পথেও রিকশা চলে, তবে কম। রাশমিন জানেনা। জানলে তো সে রিক্সায় উঠে চলে যেত। চলে গেলে তার সাথে এই হাঁটা হতো না।  এই বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত সঙ্গ দেওয়া যেত না। এই  সময়ের  জন্য, এই সঙ্গের জন্য আমি মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছি। বলেছি,  এই পথে রিক্সা চলে না। 
এমনও হতে পারে, সে সব জানে। সেও হয়তো এই সঙ্গটা চেয়েছিল। হয়তো সে আমাকে কিছুটা প্রশ্রয় দিয়েছে । হয়তো  সে আমার দৌড় কতদূর তা দেখতে চেয়েছে। কতসব ছাইপাঁশ  ভাবতে ভাবতে হলে চলে এলাম। রিক্সার ভাড়া মেটাতে যেয়ে দেখলাম, পকেট প্রায় শূন্য। টাকার প্রয়োজন অতএব বাড়ি যেতে হবে। 


রাশমিন হীন সবকিছু শূন্য শূন্য লাগছে। এই প্রথম অনুভব করলাম আমি বড় একা। আমার চারপাশে যে কোলাহল তা আসলে কিছুই না। এই যে এত বন্ধু, এত মিছিল মিটিং এত  হইচই, এত কিছুর ভেতর  আমার আপন কই? এ এক অন্য  আপন। যে আপনের  কাছে হৃদয়ের গোপন কথাগুলো একান্ত নিজস্ব কথাগুলো বলা যায়। বলে তৃপ্তি পাওয়া যায়।  সেই আপন কই? মনে হচ্ছে,  সেই আপন শুধু একমাত্র রাশমিন। আমি কি প্রেমে পড়েছি? তা না হলে অন্তরে এত শূন্যতা কেন? রাশমিনের জন্য এত কেন টান অনুভব করছি? মনে হচ্ছে এখনই ছুটে খুলনায় চলে যাই।

রুমে ঢুকে দেখি, আমার রুমমেট শাহানুর গিটারে দারুন একটা হিন্দি গান বাজাচ্ছে। আমার অন্য রুমমেটরাও তার চারপাশে জড়ো হয়ে  সেই গান শুনছে।মাঝে মাঝে তালে তালে চিৎকার করছে। শাহানুরের গিটারের হাত ভালো। সে সহজ ভঙ্গিতে দারুন দারুন সুর তোলে।দেখে মনে হয় গিটার বাজানো খুব সহজ। কিন্তু না। আমরা অনেকে অনেক সময় চেষ্টা করেছি কিন্তু বিফল হয়েছি। বৈচিত্রহীন একঘেয়েমি হল জীবনে এই গিটারটি  আমাদের মাঝে এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে । এই নতুন মাত্রার জন্য মাসুলও দিতে হয়। 

শাহনুর হর হামেশা গিটার কোলে বিপুল উৎসাহে যখন তখন বসে পড়ছে। রুমে কেউ পড়ছে, কি কেউ  ঘুমাচ্ছে তাতে ওর কোন তোয়াক্কা নেই। আমরা ব্যাপারটিতে অস্বস্তি  বোধ করলেও তা সহ্য  করছি এবং তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছি । শুধু প্রশ্রয় না তার আনন্দে দলীয়ভাবে অংশ নিচ্ছি।কিন্তু এখন আমি কিছুতেই রুমের এই হুল্লোড়ে মন বসাতে পারছি না। মনটা কোথায় পড়ে আছে। কোন এক অজানা পথের পাশে। অনিশ্চিত তার ভবিষ্যৎ। মনে মনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিলাম, রাশমিনকে  আমার চাইই চাই।যে কোন মূল্যে।এর জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে রাজি আছি। জানি এ সর্বনাশা সিদ্ধান্ত। আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা ১০০%। কিন্তু মন কোন যুক্তি মানে না। 


যুক্তিহীন  মন কিছুতেই স্থির করতে পারছি না। কোন কিছু ভালো লাগছে না। হলে আর মন টিকছে না। চারদিকে সব প্রাণহীন প্রেত পুরি  মনে হচ্ছে। 


একটা সিগারেট ধরালাম। টানতে টানতে সিদ্ধান্ত নিলাম, বাড়ি যাবো। অনেকদিন বাড়ি যাওয়া হয়নি। বাড়ি গেলে হয়তো কিছুটা ভালো লাগবে। কয়েকটা দিন থেকে আসি । ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্টের তো দেরি আছে। এর মাঝেই রাশমিনের  সাথে দেখা হওয়ার আর কোন সম্ভাবনা নেই। 





(১৩)




গতকাল বাড়ি এসেছি। খুব ভোরে মেয়েলি   কান্নাকাটির শব্দে   ঘুম ভেঙে গেল। মেজাজ এত খারাপ লাগছে সে আর বলার না। কোন বিপদ টিপদ হলো না তো? বিরক্ত হয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে বোঝার চেষ্টা করছি। এ কার কন্ঠ? এ তো আমাদের বাড়ির কারোর না। তাহলে? বুকের ভিতর হঠাৎ যেন বজ্রপাত হল। তবে কি ছেলেটা মারা গেছে?ইস বাচ্চা ছেলে! একেবারে কচি মুখ। 


গত রাতের ঘটনা। শুয়ে আছি গভীর ঘুমে।একটার মত বাজে। অনেক লোকের চেঁচামেচি কান্নাকাটির হট্টগোলে ঘুম ভেঙ্গে গেল। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি, আমাদের বাড়ির উঠানে লোকে লোকারণ্য।মেয়ে মানুষ, পুরুষ মানুষ, বাচ্চা ছেলে- মেয়ে। উঠান গমগম করছে। এক নজর দেখেই বুঝে গেছি কোন সাংঘাতিক ব্যাপার। একটা বাচ্চা ছেলের উরুর উপরে  মোটা মোটা দড়ির শক্ত গিট। হাঁটুর নিচে তোয়ালের শক্ত গিট।সে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।এ দৃশ্য আমাদের বাড়ির খুবই পরিচিত। খুব বেশি অবাক হলাম না। 

আমাদের শওকতের ছেলে সোহাগ, ক্লাস ফাইভে পড়ে।খুব মেধাবী।  তাকে সাপে কেটেছে। ঝাড় ফুকের জন্য আমার মায়ের কাছে নিয়ে এসেছে। আমার মাও অঘোরে  ঘুমাচ্ছে। দুর্বল মানুষ। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটেছে। ডাকলে উঠবে কিন্তু পরে তার আবার চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। মাথায় তেল পানি দিয়ে দীর্ঘক্ষণ বাতাস করতে হবে। মা অল্পতেই দুর্বল হয়ে পড়ে, ক্লান্ত হয়ে পড়ে। 

যাহোক মা উঠল। ঝাড় ফুক করলো। সোহাগ ভালো হয়ে বাড়ি চলে গেল। তাহলে সকালে আবার  এত কান্নাকাটি কিসের?

 আমার বুদ্ধি জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেখে আসছি এই গ্রামের সমস্ত সাপে কাটা রোগী মার কাছে আসে। মা ঝাড়ফুঁক করে। পায়ের একটি বিশেষ আঙ্গুলের মাথা আচ্ছা করে দড়ি দিয়ে  বেঁধে মন্ত্র পড়ে পড়ে  টানে। এক সময় আঙুলের মাথা জমাট কালো হয়ে ফুলে ওঠে। একটা সুচ আগুনে পুড়িয়ে শুদ্ধ করে  খ্যাচ করে আঙুলের মাথায় ফুটিয়ে দেয়।তীর বেগে কালো বিষাক্ত রক্ত ছুটে বেরিয়ে আসে। মাটিতে কলার পাতায় লবণ রাখা থাকে। রক্তাক্ত ফুটো আঙ্গুলটি সেই  লবণের ভিতরে ঠেসে ধরা হয়। ঠেসেঠেসে বিষাক্ত রক্ত বের করা হয়। এক সময় দেহ বিষমুক্ত হয়। মা অসুস্থ হয়ে পড়ে। রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে যায়। এভাবেই বছর পর বছর চলে আসছে এর কোন ব্যতিক্রম কখনো ঘটেনি। এ পর্যন্ত কেউ মারাও যায়নি। তবে কি এত দিনের নিয়মের ব্যতিক্রম হলো? সোহাগ মারা গেল? আমি আতঙ্কিত হয়ে চোখ মুছতে মুছতে  বাইরে এসে দাঁড়ালাম। দেখি জলিলের  মা আমার আব্বার পায়ে পড়ে কান্নাকাটি করছে। 




(১৪)





জলিলের  মাকে দেখে মেজাজটাই বিগড়ে গেল। আমি অনেকবার এই মহিলার সালিশ করেছি। একটা ফালতু মহিলা। কথায় কথায় শুধু সালিশ ডাকে। আজকেও হয়তো কোন সামান্য ব্যাপার নিয়ে এসেছে। আমি পুনরায় ঘরে ঢুকে দরজা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ফালতু মহিলার প্যাচাল শোনার সময় নেই। বউ শাশুড়ির ঝগড়া তাই নিয়ে আবার  সালিশ। কিন্তু জলিলের মার কান্না থামলো না। তার চিকন নাকি কান্নার সুর একসময় বিকট আকার ধারণ করল। আর ঘুমানো হলো না। বাইরে বেরিয়ে এলাম।

সে আমার বাপের পায়ে পড়ে কেঁদে কেঁটে অস্থির। আগে কখনো এতটা দেখিনি। ব্যাপার নিশ্চয়ই গুরুতর। সে বারবার আব্বার পায়ের উপর আছড়ে আছড়ে পড়ছে," ও মামু, তুমি আমার বাঁচাও।দুনিয়ায়  তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই । ও মামু, ওরা আমার সব লিখে নেবে। আমাকে রাস্তার ফকির বানাবে। আল্লাহ তুমি এর বিচার কর। "


তার কথা শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। শেষমেষ  জলিলের বউয়ের জন্য জলিলের  মাকে ভিটা ছাড়তে হবে? এ হতে পারে না। কিছু একটা করতেই হয়। আমি তার সমস্ত কথাগুলি শুনলাম। মানুষ যে এত বড় হৃদয়হীন হতে পারে তা না শুনলে বোঝা যাবে না।

ডিপজল বাহিনীর প্রধান ডিপজল জলিলের মাকে সময় বেঁধে দিয়েছে। হয় এক সপ্তাহের ভিতরে জলিলকে দুবাই থেকে দেশে আনতে হবে, না হয় জলিলের বউয়ের নামের সমস্ত সম্পত্তি লিখে দিতে হবে। ডিপজল গতরাতে সালিশ করে এই রায় দিয়েছে।এই অঞ্চলের তার রায় অমান্য করার সাধ্য কারো নেই। 





সে যা বলেছে তা অক্ষরে অক্ষরে করেও ছাড়বে-  অর্থের লোভে ক্ষমতার দাপটে। আমার বাপ এখানে কিছুই করতে পারবে না। তার সময় শেষ। সে অনেকদিন ধরে এই অঞ্চলে এককভাবে  মাতব্বরি করে আসছে-  তার সততার জোরে।  সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরাই তার শক্তি।  সবার অবিচল বিশ্বাস, আমার বাপই একমাত্র ব্যক্তি,  যে সঠিক কথা বলে। ফলে গ্রামের সমস্ত মানুষ  শেষ পর্যন্ত তার  কথা শোনার জন্য অপেক্ষা  করতে থাকে। 

দিন বদলেছে  । খারাপভাবে বদলেছে। দেশের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। দেশ আগে বারান্দায় পায়খানা করতো, এখন ঘরে বিছানায়।এই হলো বদল।  এখন আর আমার আব্বার মতো সৎ সাহসী লোককে কেউ শালিস-বিচারে ডাকে না। এখন শালিস হয় টাকায়।শুয়োরের পালের মতো দল বেঁধে ঘোঁতঘোঁত করে বেড়ায় চাঁদাবাজ, দখলবাজের দল। সবকিছু শালিস- বিচার হয় দলীয়ভাবে।সত্যিকার যারা ত্যাগি রাজপথের লড়াকু সৈনিক তারা অসহায়ের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।কারণ, যতো অন্যায় অপকর্ম হয় স্থানীয় এমপির ছত্রছায়ায়। আর এমপি মানে,এলাকার অঘোষিত ঈশ্বর।তার কথা নিয়তির মতো।আর সে এই ঐশ্বরিক শক্তি পায় সেদিন, যেদিন সে অনেক টাকার বিনিময়ে নমিনেশন কিনে আনে।আর তার ঈশরত্ব ফাইনালি  পাকাপোক্ত হয় অনেক অনেক টাকার বিনিময়ে যখন সে এমপি হয়ে যায়।এমপি মানে এলাকার সেই সব।পাঁচ বছরের জন্য সে তার এলাকার মানুষের জান মাল, মান ইজ্জত সব কিনে নেয়।এলাকার মানুষ হয়ে যায় তার ক্রীতদাস। অতএব ক্রীতদাসদের সাথে যা খুশি সব করা যায়।আর এমপির পিছন পিছন যারা রাতদিন কুকুরের মতো লেগে থাকে তারা গ্রামঘাটে আরও আরও কুকুর পোষে।এই কুকুরগুলো অধিকাংশই ননপলিটিক্যাল লোক।যেখানে এমপি নিজেই ননপলিটিক্যাল লোক।  টাকার বিনিময়ে যে এমপি, সে কি পলিটিক্যাল লোক সহ্য করবে? করবে না। রাজনীতি, এমপিত্ব তার কাছে একটা ব্যবসা।এইভাবে দিনিদিন রাজনীতি চলে যাচ্ছে অরাজনৈতিক লোকের হাতে, অসৎ লোকের হাতে।আমার বাপের মতো সৎ লোক এখন বড় অসহায়।

কী করা যায়? 

কিছুতো একটা করতেই হবে। কিন্তু আমার দল তো ক্ষমতায় নেই। তাহলে কি এই  অন্যায় পার পেয়ে যাবে? আমি সকাল সকাল দুটো খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমার দলের লোকজনের সাথে যোগাযোগ করলাম।  যদিও জলিলের ফ্যামিলির বিষয কারো অজানা নয়। তবু বিস্তারিত সত্য জানা দরকার। 


ব্যাপারটা হচ্ছে, এই ডিপজল বাহিনীর এক সদস্য কামাল। তার বউ বাচ্চা সব আছে। সে কাজ কাম করে না। সারাদিন জুয়া খেলে, আর ডিপজল বাহিনীর সাথে ঘোরাঘুরি করে। বিভিন্ন চাঁদার থেকে সামান্য ভাগ বটোয়ারা পায়, মঙ্গলগতি বাজার থেকে চাল ডাল বাকি নেয়। টাকা দেয় না। এভাবেই তার সংসার চলে। তার সাথে জলিলের  বউয়ের গোপন অবৈধ সম্পর্ক। আর গোলমাল এর শুরু  সেখান থেকে। এ নিয়ে বহুবার শালিস হয়েছে। আমি নিজেও সেই সমস্ত শালিস করেছি। কিন্তু ব্যাপারটা এর পূর্বে এত মারাত্মক আকার ধারণ করেনি। ৫-৭ দিন পূর্বে জলিলের মা তখন এশার নামাজ পড়ছিল-  এই সময়, জলিলের বউ কামাল কে নিয়ে  ঘরে দরজা দেয়। নামাজের মাঝেও জলিলের মা ব্যাপারটা খেয়াল করে। সে তাড়াতাড়ি নামাজ শেষ করে ওদের  ডেকে তোলে। এবং কামালকে তাড়িয়ে দেয়। সেই রাতেই প্রবাসী  জলিলকে মোবাইলে   সমস্ত ঘটনা খুলে বলে। এই হচ্ছে জলিলের মার অপরাধ। এখন জলিলের বউয়ের নামে সব সম্পত্তি  লিখে দিতে হবে। আর লিখে দিলে কামাল জলিলের বউকে বিয়ে করবে। সম্পত্তির অর্ধেক ভাগ পাবে ডিপজল। এই সত্যটা এই এলাকার কারো অজানা নয়। কিন্তু  কারোর সাহস নেই ভয়াবহ  অন্যায়ের প্রতিবাদ করার। আমার দলের স্থানীয় নেতাদের নামে অনেক কেস আছে। বেশি  বাড়াবাড়ি করলে যে কোন সময় আমার নামেও কেস হতে পারে। তবু  আমরা পরপর দু'রাত এলাকার দলীয় লোকজন নিয়ে  গোপন মিটিং করলাম। একটা জনমত  তৈরি হলো। যদিও জনমত সব সময় ডিপজল বাহিনীর বিপক্ষে।  কিন্তু তা মনে মনে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, এই অন্যায় প্রতিহত করতেই হবে। কৌশল  হিসেবে পরের দিন সন্ধ্যায় দলীয় মিটিং কল করা হলো। হাই কমান্ড বিষয়টির  সাথে একমত পোষণ করলো। কি হবে বলা যায় না। খুন খারাবিও হয়ে যেতে পারে।কে মরবে কে বাঁচবে একমাত্র আল্লাহই জানে। জীবনের রিস্ক ষোলো আনা। এখানে জলিল বা জলিলের  মা বিষয় না, আবার বিষয় । বিষয় হলো ,  ন্যায় আর অন্যায়।কিন্তু সামাজিক স্বার্থপর মানুষ যারা তারা সব কিছু দেখেও  অমানুষের মতো চুপ করে থাকতে পারে । কিন্তু যারা রাজনীতি করে ,  রাজনীতি সচেতন  যারা-  তারা চুপ করে থাকতে পারে না। প্রতিবাদ তারাই করে। সবকিছু তারাই ঘাড়ে তুলে নেয়।ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য,অত্যাচারিত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য  -নিজের  জীবন বাজি রেখে  সংগ্রাম করে। অথচ দিনশেষে  জানবাজ  সংগ্রামীরাই পড়ে থাকে পিছনে। অবহেলার শিকার হয়। আর ধান্দাবাজ স্বার্থপর চুপ করে থাকা মানুষগুলো টাকার বিনিময়ে বড় বড় চেয়ারে বসে।ভাবতে ভাবতে বেলা  গড়িয়ে যায়। 




(১৫)



আসরের আযান শেষ হয়েছে। কিছুক্ষণ পরে আমাদের মিটিং  শুরু হবে। আশেপাশের গ্রাম থেকে দু একজন করে নেতা কর্মি আসতে শুরু করেছে। 


আমি বসে আছি কাজল বৈরাগীর ঘড়ি মেরামতের দোকানে।নিজের শার্টের নিচে চেক করলাম। হ্যাঁ আত্মরক্ষার অস্ত্রটি ঠিক আছে।  রাস্তার ওপাশে পশ্চিম আকাশে সূর্য হলুদ রোদ ছড়াচ্ছে। তার তেজ কমে আসছে। বাতাসে পাকড় গাছের পাতায় সাঁই সাঁই শব্দ হচ্ছে। বট গাছে শালিকের কিচির মিচির। মায়াময় একটি পরিবেশ। আমাদের গ্রামের হাটের  এই দৃশ্য   সত্যিই একটা ছবির মত। হাটের মাঝখানে একটা বিরাট বকুল গাছ, একটা পাকড় গাছ, বাজারের পশ্চিম পাশে খাল ভরা পানি। উত্তর  পাশে চিত্রা নদী। নদীর ব্রিজ পার হয়ে বর্ধিষ্ণু  বাজার দুপাশের গ্রামের বসতির ভিতর ঢুকে যাচ্ছে ক্রমশঃ।  শুক্রবার এখানে হাট বসে। এই ছবির মত সুন্দর সবুজ বাজারে দানবের  ছায়া পড়েছে। আজ সেই দানবের বিরুদ্ধে আমাদের মোকাবেলা।


হাটুরে বেপারী, অস্থায়ী  দোকানদার, স্থায়ী ব্যবসায়ী লোকজন  কারো মনে শান্তি নেই। প্রত্যেককে চাঁদা  দিতে হয়। তারপরও নিস্তার নেই। ডিপজল বাহিনী যখন যাকে খুশি মারধর করে। তার লোকজন বিনা পয়সায়  বাজার করে। ভালো ভালো জিনিস ফ্রি  নিয়ে যায়। ডিপজল প্রতিদিন পাঁচটি মোটরসাইকেলে লোক নিয়ে আসে।  তাদের সবাইকে নিয়ে বাজারের হোটেলে নাস্তা করে। কোন টাকা দেয় না। টাকা চাওয়ার মত সাহসও কোন হোটেল ওয়ালার নেই। এরপর ডিপজল বাহিনী বের হয় বিভিন্ন গ্রামে। বিভিন্ন শালিস, জমি দখল ইত্যাদি  মিশনে। ন্যায় অন্যায় বলে কোন কথা নেই সব আসল ধান্দা টাকা। এলাকায় সে এক ত্রাসের  রাজত্ব কায়েম করেছে।  কারো মনে কোন শান্তি নেই।

আমাদের  মিটিং হবে কিনা কোন ঠিক নেই।  লোকজন উপস্থিতির হার খুব কম।   আমি বসে বসে গান শুনছি। দলের কয়েকজন আঞ্চলিক নেতা রাস্তার  ঐপাশে কানে কানে  শলাপরামর্শ চালাচ্ছে। কাজল বৈরাগীর  ঘড়ি মেরামতের দোকানে গান হচ্ছে- 
তোমার পত্র   এসে পৌছলো যখন, রাতের আমন্ত্রিত আমি অতিথি। শুভ হোক,  শুভ হোক।শুভ হোক  তোমার জীবন সাথী। শুভ হোক শুভ হোক। 


আমার অন্তর কেঁপে উঠলো। আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি,রাশমিনের  বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি  আমন্ত্রিত অতিথি। অনুষ্ঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে,  যন্ত্রণা বিদগ্ধ বুক চিরে , গলা উপচে   বেরিয়ে আসছে এই গানের ধ্বনি। আমি যেন পাগলের মত চিৎকার করে গাইছি এই গান। রাসমিন লাল শাড়িতে, আধো  ঘোমটার ফাঁকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে আমাকে। তার সমস্ত শরীর স্বর্ণের অলংকারে ঝলমল  করছে। আগুনের মতো রূপ তার সোনার মত জ্বলজ্বল করছে।

বুঝলাম, রাশমিন  আমার মনের চেতনে,অবচেতনে - সমস্ত খানে দাপটে   বেড়াচ্ছে।তাকে পাওয়ার চেষ্টাও বৃথা ভোলার চেষ্টাও বৃথা। আবার না ভুললেও জীবন হবে সর্বনাশা। কারন, আমি তাকে কখনোই পাব না। কেননা, যখনই সে আমার  রাজনৈতিক পূর্ণ পরিচয় পাবে, তখনই সে এক ঝটকায় দশ হাত  পিছিয়ে কথা বলবে। এটাই দেখে আসছি। সে সরে যাবে। আর আমি তার জন্য সারা জীবন অপেক্ষায় থাকবো।কেঁদে  কেটে  বুক ভাসাবো। ডিপজলের সাথে আমাদের এই যুদ্ধ হয়তো শেষ হবে, কিন্তু প্রেম বনাম রাজনীতি,  এই যুদ্ধ হয়তো কখনোই শেষ হবে না। অথচ রাজনীতি ছাড়া প্রেম নেই, প্রেম ছাড়া রাজনীতিও নেই। ফিলিস্তিনের গাজার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, সেখানকার মানুষের রাজনীতি ছাড়া কোন উপায় নেই। রাজনীতি মানে কিন্তু যুদ্ধ। সেখানকার পরাধীন মানুষের  জীবনে আনন্দ আহ্লাদ, প্রেম ভালোবাসা বলে কিছু কি আছে ?  যতদিন না ওই জনপদ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হচ্ছে ততদিন তাদের মনে সত্যিকারের প্রেম ভালোবাসা, আনন্দ আহ্লাদ  বলে কিছু জন্মাবে না।আর  রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য যারা লড়ছে তারাই  রাজনীতিক তারাই যোদ্ধা।অথচ দিন শেষে স্বার্থপর শান্তি প্রিয় চুপচাপ ঘাপটি মেরে থাকা লোকগুলো রাজনীতিকদেরই   ঘৃণা করে। 

সবাই যখন ঘৃণা করে। হয়তো রাশমিনও করে।আজ হোক কাল হোক আমার এই পরিচয় তার সামনে উন্মোচিত হবে। সে না হয় হবে। কিন্তু এখন তো ভীষণভাবে মনে পড়ছে তাকে। এইতো জামার পকেটে ছোট্ট নোট বুকে, তার মোবাইল এবং টেলিফোন নাম্বার দুটোই আছে। 

কল করব? 
কল করে কি বলবো? 
এখনো তো ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দেয়নি।তাহলে কিভাবে কথা  শুরু করা যায়? 

এত কিছু ভেবে কিছু করা যায় না। যাহোক একটা কিছু বলা যাবে। আগে শুরু তো করি। বিসমিল্লাহ বলে বুকে  সাহস সঞ্চয় করে মোবাইলে নাম্বার ঢুকিয়ে দিলাম। 

ওপাশের মোবাইলে রিং হচ্ছে । আমার বুকের ভিতরে হার্টবিট দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। শরীর দিয়ে ঘাম ছুটে যাচ্ছে। 

কে যেন পিছন থেকে ধাক্কা লাগালো।বলল, "পালাও।ডিপজল   বাহিনী এসে গেছে। "


রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি,  একেবারে রণসজ্জা। সাজোয়া বাহিনী। 
মাইক্রো,প্রাইভেট,  পিকআপ, মোটরসাইকেল। বাজারের উপরে সমস্ত পাকা রাস্তা  তারা দখল করে বসে আছে মুহূর্তে। বিশাল এক ভয়ঙ্কর পরিবেশ তারা তৈরি করে ফেলেছে। ধারালো অস্ত্র। অস্ত্র উঁচিয়ে উচিয়ে এককেজন লাফিয়ে লাফিয়ে গাড়ি থেকে নামছে। কারো হাতে পেট্রোলের ঢম।পেট্রোলের আগুন দিয়ে সব পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে। ভয়ে আমার গলা বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ঝেড়ে দৌড় লাগালাম। বাজারের ভিতরে আশ্রয় নিলাম। পিছনে এখন হুড়মুড় করে দোকানপাট বন্ধ হওয়ার শব্দ ভেসে আসছে।

 


মানুষ যে যেদিকে পারছে দৌড়ে পালাচ্ছে। সবাই বুঝে ফেলেছে, আজ ভয়াবহ কিছু একটা হবে। 

দৌড়ে এসে এক দোকানের পেছনে গলির ভেতর নিজেকে লুকালাম। দেখি , এখানে আমাদের আরো দু চারজন ইতিমধ্যে লুকিয়েছে। এখানে আমাদের তরুণ যুব নেতা রফিক রয়েছে। সে খুব লাফালাফি করছে। বলছে,"চল যায় ধরি। এখনি গ্রাম থেকে লোকজন এসে যাবে। "

শেষে তার সাহস দেখে বা দুঃসাহস দেখে আমরা কিভাবে জানি ঢোক চিপতে চিপতে  অনুপ্রাণিত হলাম। আমি আজও ভেবে অবাক হয়ে যাই, কিভাবে ওই নিশ্চিত মৃত্যুর মুখেও অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম? আসলেই নেতৃত্ব যে কি তা ওই তরুণ নেতাকে দেখেই জেনেছি।  আমরা ৪-৫ জন ঘুরে দাঁড়ালাম। রাস্তার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছি,  তখনও আমরা খালি হাতে। আমাদের প্রতিপক্ষ   অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। অথচ আমরা শুধু বুকে অদম্য সাহস নিয়ে কী করতে যাচ্ছি এক দানবের বিরুদ্ধে? রাস্তার কাছাকাছি পৌঁছে আমাদের হুশ হল।  আমরা তো একদম খালি  হাত। কি এক মহা ভুল  করতে যাচ্ছি।

যুবনেতা রফিক আবারো বলল, "ওরে লাঠি ধর।"

 কিন্তু লাঠি কোথায়? কোথাও একটা খড়কুটো খুঁজে পাচ্ছি না। শেষে এক মোটা কলার কাঁদি  বাগিয়ে ধরল রফিক।সে কাদির শরীর থেকে ব্যাপারী কলা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে বিক্রি করে শেষে ন্যাংটো করে  ফেলে রেখে গেছে। সেই কলাহীন কাঁদিটি এমনভাবে ধরেছে, মনে হচ্ছে-  এমন কিছু একটা দখল করে বসেছে এর এক আঘাতে পুরো ডিপজল বাহিনী  উড়ে যাবে।সে আবার তাগাদা দিতে লাগলো, "ওরে লাঠি ধর। "

 আমরা দু একজন কঞ্চির মত শুকনো দু একটা দুর্বল বটের  ডাল কুড়িয়ে পেলাম। এবার তাই নিয়েই মোকাবেলা  করতে যাচ্ছি। দুই দোকানের ফাক দিয়ে তাকিয়ে দেখি, আমাদের দলের হাসেম  ভাই ডিপজলের হাতে ধরা পড়েছে। ডিপজল   তার কলার ধরে বিভিন্ন হুমকি ধামকি দিচ্ছে, আর লাথি চড় কিল সমানে চালিয়ে যাচ্ছে।একজন লম্বা কালো লোক হাসেম ভাইকে বারবার গুলি করতে যাচ্ছে, কিন্তু ডিপজল তাকে বারবার বাধা দিচ্ছে। কারণ হাশেম ভাই ডিপজলের সম্পর্কে চাচাতো শালা। তাই তাকে প্রাণে মারতে চাচ্ছে না। কিন্তু আমরা তো তার ওই জাতীয় কোন আত্মীয় না। আমাদের কাউকে ধরতে পারলে ঠিকই গুলি করে দেবে। অবস্থা দেখে কলার কাদিটাদি বিসর্জন দিয়ে যে যেদিকে পারলাম, দৌড়  লাগালাম। এবার বাজার টাজার নয় একেবারে জঙ্গল। প্রবীণ নেতা মিলন বিশ্বাস আমাকে বলল,  "ওরে,  গ্রামে যেয়ে  লোক ডেকে আন। "

আমি গ্রামে এসে যাকেই বলি, "ডিপজল বাহিনী বাজারে লোকজন মারছে- চলো।  "

সবাই আমাকে বলে, "মাথা খারাপ হয়েছে নাকি তোমার? ঘরে বসে থাকো।"

 আমি দিশেহারা হয়ে কী করব ভেবে পাচ্ছি না। এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছি। হঠাৎ দেখতে পেলাম, অল্প বয়স্ক ছেলে পুলে খেলা করছে। তাদের কাছে যেয়ে বললাম, "এই তোরা খেলা করছিস? মারামারি দেখবি? চল বাজারে মারামারি বেঁধেছে। "

যেই না বলা অমনি ছেলেপুলে মারামারি  দেখতে যাওয়ার আনন্দে হাত তালি দিয়ে হল্লা করে  উঠলো। আমি বললাম, "ধর। "

ওরা দ্বিগুণ জোরে চিৎকার করে বলল,  "ধর। "

আমরা দৌড়াচ্ছি আর চিৎকার করছি, "ধর- ধর -ধর-। "

পথে আরো কিছু লোক আমাদের সাথে যোগ দিলো। সবাই দৌড়াচ্ছি আর চিৎকার করছি,"  ধর- ধর- ধর-।" 

 চিৎকার যারা করছে তারা কেউ জানে না কাকে ধরতে তারা চিৎকার করছে। আমি বলছি ধর।  সবাই বলছে ধর । এই হল লিড। এই হলো নেতৃত্ব। সবকিছু সব সময় সাজানো গোছানো পাওয়া যায় না। এলোমেলো বিশৃঙ্খলা পরিবেশের ভিতর থেকেই নেতৃত্বের সুশৃংখল সূত্রটি আবিষ্কার করে নিতে হয়। 

নদীর  ওপারের গ্রাম থেকেও আমাদের চিৎকার শুনে লোকে  ধর ধর বলে চিৎকার করছে। খালের ওপার থেকেও একই অবস্থা। শেষে ডিপজল বাহিনীর লোকজন দিশেহারা হয়ে যে যেদিকে পারল ছুটে পালাতে লাগলো। আমরা তাদের যানবাহনগুলোর উপর আক্রমণ করলাম। গাড়িতে ড্রাইভার ছিল, সাথে সাথে তারা গাড়িগুলো নিয়ে সরে পড়লো। ডিপজলের লোকজন সব পালিয়ে গেছে। বাজারে এখন ডিপজল একা। শুরু হলো গণপিটুনি। এলাকার বহু লোকের ক্ষোভ ছিল  তার ওপর।  গণপিটুনির চোটে তার মাথা ফেটে গেল। তার দলের লোকের অনেকের হাত পা ভাঙ্গা পড়ল। পতন। আহ! কি মহা পতন। ডিপজল স্বপ্নেও ভাবেনি তার এই মহাপতন হতে পারে। এতবড় যে মহাপ্রতাপশালী শেষে তাকে বোন বাদাড় দিয়ে পালিয়ে  পালিয়ে হাসপাতাল যেতে হয়েছিল। 

কিন্তু এরপরই এলাকার লোকের উপর নেমে এলো গজব। সন্ধ্যা হতে না হতে ট্রাক ভর্তি করে ডিপজলের  লোকজন আসতে লাগলো। ছোট্ট মঙ্গলগাতি বাজার লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল।পুলিশ এলো, তার ভেতর ডিপজলের দলের লোক ফাঁকা গুলি ছুড়ে মিছিল শুরু করল, "সন্ত্রাসীরে কালো হাত ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও। "

তারমানে তারা আমাদেরকে সন্ত্রাসী বলে স্লোগান দিচ্ছে। অথচ ডিপজলের লোকজনই তো প্রকৃত সন্ত্রাসী। 

 মিছিলে আশেপাশের গ্রামের লোকজন এসে যোগ দিচ্ছে। ওরা ডিপজলের দলের সমর্থক। মিছিলের ভেতর থেকে বাজারে বোমা ছুড়ে মারা হচ্ছে। বোমার আওয়াজে ছোট্ট বাজারটি এবং আশেপাশে গ্রাম কেপে কেঁপে  উঠছে। মিছিল শেষে তারা আশেপাশের গ্রামের ৫০ /৬০ টি বাড়ি পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দিল। পুলিশ তাদের পাহারা দিল। পুলিশ তো কলের পুতুল, কারণ ডিপজলের দল ক্ষমতায়। পুলিশের কিছু করার নেই। 

আমরা নদীর ধারে নাসির মন্ডলের বাগানের ভেতর লুকিয়ে থেকে অসহায়ের মত সব চুপচাপ দেখলাম। আশেপাশের গ্রাম থেকে আগুনের ধোয়ায় তখন আকাশ বাতাস একাকার। আর চিৎকার চেঁচামেচি, গুলির আওয়াজ,বোম এর বিকট শব্দে   পুরো এলাকা তখন রণক্ষেত্র। 

রাত যত গভীর হলো পরিবেশ ততো শান্ত হলো। রাত প্রায় তিনটার দিকে আমরা ২০-২৫ জন জঙ্গল থেকে বের হয়ে  নদীর ধারে মিটিং করে, সবাইকে গ্রামে  অবস্থান করার জন্য বলে বেরিয়ে পড়লাম। আমরা চিহ্নিত চার-পাঁচজন গ্রাম ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু তখন ক্ষুধায় পেটের এত খারাপ অবস্থা যে এক পাও  এগুতে কষ্ট হচ্ছে। শেষে সাব্বির মুন্সির বাড়িতে এসে হাজির হলাম। সাব্বির মুন্সি আমাদের দলের লোক এবং ইউপি মেম্বার। তার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো। দলের প্রতি তার প্রচন্ড ভালবাসা আছে। সাব্বির মুন্সির বাড়ির লোকজন আমাদের পেয়ে যেন হাতে ঈদের চাঁদ পেল। সেখানে যেন বিপ্লবের জোয়ার বয়ে গেল। এবাড়িতেও একটি ঘর পোড়ানো হয়েছে। কিন্তু সেটি এদের কাছে এখন  কোন বিষয়ই না। আমরা বেঁচে আছি ভালো আছি সেজন্যই তারা মহা খুশি। তারা রাতেই মুরগি জবাই করে আমাদের খেতে দিতে চাইলো। আমরা বললাম, "সময় নেই। রাত থাকতে থাকতেই এলাকা ছাড়তে হবে। "

অগত্যা পান্তা ভাত আর  ডাল খেয়ে বিদায় হলাম। ডিপজল বাহিনী আমার বাড়িতেও চড়া হয়েছিল। ঘরে পেট্রোল ও ঢেলেছিলো। কিন্তু আগুন লাগাতে সাহস পায়নি। কারণ ডিপজলের দলে আমাদের এক আত্মীয় বড় মাপের নেতা। শেষমেষ তারা কিছু গালিগালাজ করে ফিরে গেল। সুখের কথা হল,  তারপর থেকে ডিপজল বাহিনীর অত্যাচার বন্ধ হয়ে গেল। মার খেয়ে ডিপজলের চৈতন্য উদয় হল। আসলে মাইরের উপর কোন ওষুধ নাই। মাইরের শিক্ষা স্থায়ী হয়। 

কিন্তু যে জলিলের মাকে উপলক্ষ করে এত কিছু করলাম তাকে নাকি  খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।কোথায় গেল জলিলের মা? 






(১৬)




দুইদিন পরের ঘটনা। পেপারে নিজের নাম দেখে চমকে উঠলাম। সেদিনের সেই ঘটনা নিউজ হয়ে গেছে। আর সেখানে সন্ত্রাসী হিসেবে আমার নাম লেখা হয়েছে। ডিপজলরা যেহেতু সরকারি দলের লোক, তাদের নাম দলীয় নেতাকর্মী হিসেবে দেখানো হয়েছে। সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা করে শেষমেষে আমরাই সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছি।অবশ্য তাতে সমস্যা নেই। আমি যে হলে থাকি এখানে সবাই আমার দলের লোক। 


সেদিন রাতে শরীরের উপর দিয়ে খুব ধকল গেছে। সকালে ঘুম ভেঙেছে সাড়ে নয়টায়। শরীর ব্যথা ব্যাথা হয়ে আছে। সেদিন রাতে কমছেকম দশ মাইল হাঁটতে হয়েছে। সারারাত নির্ঘুম। দিনের বেলায় এমপি সাহেবের সাথে দেখা করে সোজা হোস্টেলে। তারপর থেকে ঘুম আর ঘুম। ঘুম আর কিছুতেই ছুটতে চায় না। এদিকে প্রচন্ড ক্ষুধাও লেগেছে। শরীর খুব দুর্বল। কোনোমতে ঘুম থেকে জেগে একটা সিগারেট ধরালাম। সিগারেট খেয়ে শরীর আরো দুর্বল হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি গামছা লুঙ্গি নিয়ে নিচে নেমে এলাম। 

ঘুম ভাঙতে দেরি হলে কি হবে এরমধ্যেই  কলেজ ক্যাম্পাস জমজমাট হয়ে উঠেছে। অবশ্য তখনও রোদ্রে ঘাসের উপরকার শিশির ঠিকমতো শুকায়নি। সেই ভিজে ভিজে ঘাসের উপরেই রোমিও জুলিয়েটরা জোড়ায় জোড়ায় বসে গেছে। একটা জুটি আমাদের হোস্টেলের সামনে পুকুরের পানির উপরে গাছের শেকড়ে বসে বাদাম চিবুচ্ছে। গাছটা অনেকদিন ধরেই পুকুরের দিকে ঝুঁকে আছে। পড়েও পড়ে না। তার অনেকগুলি শেকড় পানির উপর ঝুঁকে আছে। শেকড়গুলি জুলিয়েটদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। আমি দাঁত ব্রাশ করতে করতে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছি। আজ এতগুলি বছর এই ক্যাম্পাসে। সেই ইন্টারমিডিয়েট থেকে শুরু করে কতগুলো বছর পার করলাম। তবু আজ পর্যন্ত কোন মেয়েকে নিয়ে  এই ক্যাম্পাসের নরম ঘাসে বসতে পারলাম না। জানিনা কেন? হয়তো আমার চেহারাটা খুব খারাপ। মেয়েরা পছন্দ করে না।


মেয়েরা কিংবা ছেলেরা শুধু আমার কাছে আসে উপকারের জন্য।  তারপর কাজ শেষ হলে কেটে পড়ে। কোন ভালো ছেলে বন্ধুও তো আমার নেই। বন্ধু বলতে যা বোঝাই তা  একমাত্র তৌফিক। রাজনৈতিক যে সমস্ত সহযোদ্ধা আছে তাদের অধিকাংশই প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা সব সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।  আর কিছু ছিদ্র খুঁজতে  ব্যস্ত। মনের কথা বলার  মত, শোনার মত আমার কেউ নেই। আমি বড় একা। ওই রাশমিনকে যদি পেতাম। তার নরম হাত দুটি ধরে, নরম ঘাসের উপর বসে মনের  কথা বলতাম সমস্ত হৃদয় উজাড় করে। হাই, আমার জীবনে  কখনো হয়তো তা আর হবে না। প্রেমহীন এ জীবন শূন্য মরুভূমির মত হয়ে থেকে যাবে। কোন পেলোব ছোঁয়ায় সবুজ অরণ্যের মতো জেগে ওঠা হয়তো কখনো হবে না।  তবুও আমি আশায় বুক বেঁধে বসে আছি। একদিন হয়তো রাশমিন আমার জীবনে আসবে। জীবনটা রঙে রঙে ভরিয়ে দেবে। 


কত কিছু ভাবতে ভাবতে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।  বন্ধু সাইফুল বলল, "চল, ওপারে যাই। "

"ওপারে? তোর যে শরীর।"

 আমার সাবজেক্টমেট সাইফুল বেশ নাদুস নুদুস। সে বলে কিনা ওপারে যাবে। ওপার তো বেশ দূর।সে যেতে পারবে না। আর তাছাড়া এই পুকুরও খুব গভীর। শুধু গভীর না ভয়ংকর। আমি যতবার ওপারে গেছি প্রতিবারই পুকুরের মাঝখানে গেলেই সেই ভয়ংকর ঘটনাটা আমার মনে পড়ে। আর মনে হয়,  এই আমার পা টা কেউ  টেনে ধরল। এই আমি মনে হয়  ডুবে গেলাম।  মনে মনে শুধু ভাবি, কোনোভাবে কুলে পৌঁছাতে পারলে হয়, আর কখনো নয়। আসার সময় ডাঙ্গা দিয়ে ফিরে আসবো। কিন্তু তা আর হয় না। আবার ভয়ে ভয়ে সাঁতার দিতে দিতেই ফিরে আসি।সাইফুলের প্রস্তাব শুনে আমার সেই ভয়ংকর ঘটনাটার কথা মনে পড়ে গেল। আমি কিছুতেই ওপারে যেতে রাজি নই। 

কিন্তু ও আমাকে টিটকারী করছে। ওর মত মোটা সোটা ডোবারের টিটকারি আমার সহ্য হচ্ছে না। বললাম,  "কি আর করা চল। "

মাঝখানে এসে আজ আমার পা যেন পাথর হয়ে যাচ্ছে। সেই ঘটনাটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেদিন ছিল শুক্রবার। আমাদের হোস্টেলের সামনেই ফুটবল খেলা হচ্ছে। সিনিয়র জুনিয়র খেলা। রিপন জুনিয়রদের ভিতর সবচেয়ে ভালো খেলোয়াড়। সে পরপর তিনটি গোল দিল। ছেলেটি খেলায় যেমন ভালো নেশা ও তেমন জোরালো। প্রতিদিন সন্ধ্যা বেলা সে কলেজ ক্যাম্পাসে বসে গাঁজা টানতো। যদি জিজ্ঞেস করা হতো, "রিপন কি করছো?"

"ভাই, একটু সবজি খাচ্ছি। "

রিপনের হাসি হাসি জবাব। কি আর করা আমিও হেসে চলে আসি। 

তো আজ।খেলার মাঝে মাঝে বল পুকুরের পানিতে  পড়ে যাচ্ছে। কেউ যেয়ে  উঠিয়ে নিয়ে আসছে। আর তাছাড়া এই পুকুর উন্মুক্ত গন  পুকুর।স্টুডেন্ট  ছাড়াও আশেপাশের লোকজন সব সময় এই পুকুরে গোসল করে। ফলে সব সময় কেউ না কেউ পুকুরে থাকেই।খেলতে খেলতে একবার বলটা পুকুরে ঠিক মাঝ বরাবর চলে গেল। পুকুরে একটা বাচ্চা ছেলে গোসল করছে। তাকে অনুরোধ করা হল। সে কিছুতেই রাজি হলো না বলটা কুড়ি আনার জন্য।  হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই রিপন ঝাঁপিয়ে পড়ল পুকুরে। খেলা মাত্র দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হয়েছে। তাহলে রিপন মনে হয় আর খেলতে চাই না। বলা যায় না গাঁজা খোর  মানুষ তো। গতিমতির ঠিক নেই। ছেলেটা কেমিস্ট্রিতে অনার্স পড়ে। এবার সেকেন্ড ইয়ারে। সে তরতর করে সাঁতার কেটে যেয়ে বলটা ধরে ফেলল। তারপর বল নিয়ে ডুব সাঁতার কেটে এগিয়ে আসতে লাগলো। এমনি করতে করতে এক ডুব দিয়েছে,  আর ওঠে না। সবাই তাকিয়ে আছি-  এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা। রিপন আর ওঠে না। ওঠেনা তো ওঠেই না। শেষে আমরা সবাই ঝাপিয়ে পড়লাম। কিন্তু কোথাও রিপন নেই। হলের সবাই লুঙ্গি গামছা পরে ঝাপিয়ে পড়লো।

 


রিপনকে খুঁজে পেল না। আসলে পুকুরটা এত গভীর যে অতো তলে কারো পক্ষে যাওয়া সম্ভব না। শেষে জাল এলো,তাতেও কাজ হলো না। পরে দমকল বাহিনী খবর দেওয়া হল, ডুবুরি এলো। সন্ধ্যার একটু আগে রিপন উদ্ধার হল মৃত অবস্থায়। তখনো তার বুকের কাছে বল ধরা। আশ্চর্য ব্যাপার। মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে হাসছে। আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলছে। 


শেষমেষ চোখ লাল করে উঠে আসলাম। নাস্তা খেলাম। নাস্তা টাস্তা শেষ করে টিভি রুমে বসে পেপার পড়ছি। দেখি লোক সমাজ পত্রিকায় আমার নাম। ডিপজলের সাথে গ্যাঞ্জামের কাহিনী রংচং করে পেপারে দিয়ে দিয়েছে। সেখানে আমাকে দেখানো হয়েছে সন্ত্রাসী হিসেবে,ডিপজল কে  দেখানো হয়েছে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। পেপার পড়ছি, শাহানুর এসে জানালো, আমার গেস্ট এসেছে। অনুমান করার চেষ্টা করলাম কে আসতে পারে আমার কাছে? ভাবতে ভাবতে গেস্ট রুমে ঢুকলাম। 




(১৭)




আরে, এ যে রাশমিন। আমি ভিতরে ভিতরে চিৎকার করে উঠলাম। 

সেই চোখ হাজার কথার ছুটোছুটি। দুটি চোখ দুটি জল পদ্ম। সদ্য ফুটে পানির উপরে ভেসে আছে। আমি কি বলি কি না বলি। শত কথা মনের দরজায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, কিন্তু বাক্যের দরজা অতি সংকীর্ণ।  সব আটকে যাচ্ছে। আমি নির্বাক। কি বলবো? একটি কথাই শুধু ভাষারূপ পেল,"রাশমিন,  কেমন আছো? "
এ শুধু প্রশ্ন নয় এ আমার হৃদয় নিংড়ানো আবেগের টুকরো। সে যেন সবই বুঝলো। আমার আবেগের তীব্রতা সে অনুভব করল। তারপর হাসিতে দুলে দুলে উঠতে লাগলো। তার চটুল হাসির তোড়ে আমার জমাট ঘন আবেগ তরল হয়ে গেল। আমি ধাতস্ত হলাম। লজ্জা পেলাম। মনের গোপনে কত তীব্রভাবে তাকে কামনা করেছি, একটিমাত্র কথার পিঠে চড়ে সেই আবেগ প্রকাশ হয়ে গেছে। আমি যেন ফাঁকা হালকা হয়ে গেছি। মানুষ মনে মনে কত কিছু সম্ভব অসম্ভব ভাবে। তাই বলে কি তার সবকিছু নির্লজ্জের মত, কাঙালের মত প্রকাশ করে ফেলতে হবে? জানিনা রাশমিন  আমাকে কি ভাবছে? সে হয়তো আমাকে একেবারে ব্যক্তিত্বহীন পাঠা ভেবে  বসে আছে। বললাম,"কখন এসেছ? "

"এইতো এসেই আপনাকে খবর দিলাম। আপনি দাঁড়িয়ে কেন? বসেন। "

আরে তাইতো আমি এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছি। 

বললাম, "রুমে চলো। "

রুমে এসে আমি আমার বেডে বসলাম। রাশমিন আমার টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে আছে। টেবিল ফ্যানের বাতাস তার চোখে মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। হায় জীবন,যদি বাতাস হতে পারতাম। কি অপদার্থ মানুষ আমি। 

ফ্যানটা বেশ কিছুদিন মোছা হয় না। সে যদি খেয়াল করে, কি ভাববে আমাকে? টেবিলের তাক থেকে সে খুঁজে খুঁজে আমার বাঁশের বাঁশিটা বের করে আনলো। হাতের বাঁশিটা নাড়তে নাড়তে জানতে চাইল, " এই বাঁশিটা কার? আপনার, বাজাতে পারেন? "

আমি লজ্জিত ভাবে বললাম, না মানে কোন রকম চেষ্টা করি আর কি। 

"তাই, আপনার তো অনেক গুণ? এতদিন জানতাম আপনি একজন ভালো স্টুডেন্ট। এখন তো দেখছি বংশীবাদকও।আর কি কি পারেন? "

আমার যেন চোখ ফেটে পানি বের হয়ে আসলো। কত কথা মনে পড়ে গেল। আমি যে একজন ভালো স্টুডেন্ট এ কথা প্রায় ভুলতেই বসে ছিলাম। এসএসসিতে স্কুলের ভিতর ফার্স্ট হয়েছিলাম। সবাই কি খুশি। আমি তখন রাশমিনদের গ্রামে লজিং থাকতাম। তখন কত নাটক লিখেছি। নাটকের দল গঠন করেছি। সবাই মিলে অভিনয় করেছি। প্রতি ঈদে আমরা সেখানে নাটক মঞ্চস্থ করতাম। কত সুন্দর আনন্দের খুশির ছিলো সেই দিনগুলি। ওদের গ্রামের মানুষ আমাকে কত ভালবাসত। কত ভক্ত ছিল আমার। রাশমিন জানতে চাইলো আমি এখনো নাটক করি কিনা। 

বললাম,  "না।এখন আর  সময় হয়ে ওঠেনা। মাঝে মাঝে খুব মন খারাপ হলে বাশিটা নিয়ে বসি। "

শাহানুর হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে বলল, "  আরে মামা, খালি পেটে গল্প জমে? "

তাইতো, রাশমিন কতদূর থেকে এসেছে। তাকে খালি পেটে বসিয়ে রেখে  শুধু বকবক করছি। শাহানুর কে টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললাম, 
"একটা এক লিটারের কোক, কয়েকটা কেক, চানাচুর, কলা, বিস্কুট নিয়ে আসো। "

শাহানুর সানন্দে নাচতে নাচতে  চলে গেল।

 



রাশমিন বলল,   "এই শোনেন, শোনেন, আমার জন্য কিছু আনতে হবে না। আমি নাস্তা করে এসেছি। এখন আর কিছু খেতে পারব না।"

" আরে না তাই কি হয়? আমার হলে প্রথম  আসলে। খালি মুখে চলে যাবে? তাই হয় নাকি?"আমি ব্যাস্তভাবে প্রশ্ন করলাম।

রাশমিন তার চোখে একটু হাসলো,   "কে চলে যাচ্ছে? আপনি তো আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। আরে আপনার হাতে ওটা কি? "

আমি আতঙ্কগ্রস্থের মতো উত্তর দিলাম,"লোক সমাজ। "

"  দেন দেখি। "

আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও লোকসমাজ পত্রিকা তার হাতে  দিলাম। যেখানে  বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়। কেন রাশমিন একদিন আগে,অথবা পিছে আসতে পারতো না? কিংবা লোক সমাজে আমার খবরটা আজকে না প্রকাশিত হয়ে   অন্য একদিন তো হতে পারতো।তাহলে রাশমিন  দেখতে পারত না। রাসমিন যদি খবরটা পড়ে কি ভাববে আমাকে? আমি আতঙ্কে আছি। রাশমিন কিছু খাচ্ছে না। 

"এ কিরকম কথা। তুমি কিছু খাবে না? না খেলে কিন্তু আমি কষ্ট পাবো। " আমি কষ্ট এবং আতঙ্ক মিশ্রিত কণ্ঠে বললাম।

"কেন, কষ্ট পাবেন কেন?"

" বা, তুমি প্রথম আমার রুমে আসলে,  তুমি তো আমার অতিথি।"

"  দেখেন আমি কিছুক্ষণ আগে অনেক কিছু খেয়ে এসেছি। আপনি খামোখাই কষ্ট পাচ্ছেন। "

" আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে এগুলো প্যাকিং করে ব্যাগের ভিতর দিয়ে দিই। বাসায় যেয়ে খাবে। "

 "  আপনি তো আচ্ছা মানুষ। "


রাশমিনের হাসি মুখ দেখে আশ্বস্ত  হলাম। খাবার কিছু প্যাকিং করে দিলাম বাদ বাকি রুমমেটরা মহানন্দে ভাগ বাটোয়ারা করে খেয়ে নিল। বিদায় বেলায় রুমমেটরা রাশমিনকে মাঝে মাঝে আসতে বলল। অতিথি এলেই তো ওরা খুশি। ফ্রি ফ্রি খাওয়া জমে ওঠে। 
সিঁড়ি দিয়ে  নামতে নামতে রাশমিন বলল,"মুন্সি মেহেরুল্লাহ ময়দানে নাকি  বাণিজ্য মেলা হচ্ছে?"

আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম, "হচ্ছে।  জানো মেলায় দারুন একটা খেলা হচ্ছে। শুণ্যে মোটর সাইকেল চালনা।"

রাশমিন বিস্মিত হয়ে বলল," শুণ্যে? সেটা কিভাবে সম্ভব? "

আমি দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বললাম, "হ্যাঁ শুণ্যে।দারুন দুঃসাহসিক   ব্যাপার। দেখবে? কত স্পিডে যে চালায় তার কোন হিসেব নেই।"





(১৮)




যশোর টাউন হল ময়দানে দারুন বাণিজ্য মেলা বসেছে। কত দেশ-বিদেশের জিনিস যে বিক্রি হচ্ছে। ইরানি কার্পেট, দেশি-বিদেশি খাবার। রাতে গান বাজনা। কত কিছু। মাঠের চারিদিকে স্টল। খাবারের দোকান। আমরা মাঠের মাঝে একটা স্টলে বসলাম।  কয়েকটা টেবিল। চারপাশে চেয়ার। সামনের টেবিলে একটা পানির বোতল। আগেই পিপাসা লেগেছিল। পানির বোতল দেখে পিপাসা টা আরো বেড়ে গেল। বোতলের মুটকি খোলাই ছিল।   সেটি সরিয়ে ঢক ঢক করে সবটুকু পানি খেয়ে নিলাম।

রাশমিন বিরক্ত হয়ে বলল,  "চলেন, এখানে খুব গরম। ভালো লাগছে না। "

"এত সুন্দর পরিবেশ আর তোমার ভালো লাগছেনা?"

"এখানে সুন্দরের কি দেখলেন? পণ্য  বিক্রির জন্য চাকচিক্য করে রেখেছে। ওগুলো সৌন্দর্য নয়, বাণিজ্যিক ফাঁদ। "

" বাহ, তুমি তো খুব সুন্দর কথা বলো।"

" যা সত্যি তাই বললাম। "

কথা বলতে বলতেই একটি বাচ্চা ছেলে এসে,  খালি বোতলটি হাতে নিয়ে বলল, আপনার বিল  দশ টাকা।

"কিসের বিল ১০ টাকা? "

"পানির। "

"পানির? এই এটা কি তোর ঢাকার শহর যে পানির  বিল দিতে হবে ? "

"জি। ওটা মিনারেল ওয়াটার। "

" মিনারেল  ওয়াটার তা এখানে মুখ খুলে রেখেছিস কেন? " আমি রেগে জিজ্ঞেস করলাম। 

বাচ্চা ছেলেটি আমার রাগ গায়ে মাখল না। সে মাথা চুলকে বলল, "দেন, টাকা দেন। "

আমি পকেটে হাত ঢুকালাম। দরকার নেই।সাথে রাশমিন রয়েছে।  কি ভাবতে কি ভাববে। মেয়ে মানুষ সাথে থাকলে সবাই তাকে অসহায় ভাবে। বাসের কন্ডাক্টার বেশি ভাড়া আদায় করে নেই। রিক্সাওয়ালা বেশি ভাড়া দাবি করে। দোকানে মালের দাম বেশি চায়। অগত্যা সিদ্ধান্ত নিলাম একে টাকা দিয়ে বিদায়  করি। কিন্তু পকেটে একটাকাও নেই। একটা কয়েনও না। তারমানে  টাকা আনতে ভুলে গেছি। ব্যাপারটা রাশমিনকে বুঝতে না দিয়ে উঠে স্টল মালিকের কাছে গেলাম। বিনয়ের সাথে বললাম, "ভাই, বিলটা বিকেলে নেন। "

" আমি তো আপনাকে চিনি না।"

"  আপনাকে চিনতে হবে না। আমি তো আপনাকে চিনি। আমরা প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় মেলায় আসি। তখন দিয়ে যাব। "

দোকানি রেগে উঠে বলল,  "রাখেন মিয়া। ধান্দা মারার জায়গা পাওনা। খালি পকেটে মেয়ে মানুষ নিয়ে  ফুর্তি করতে বেরিয়েছে। গায়ের শার্ট খুলে দিয়ে যাও মিয়া। "

সে দাঁত কেলিয়ে টিটকিরি করে কথাগুলো বলল। আমার গায়ে আগুন ধরে গেল। নিজের চেহারা দেখালাম। 

" এই খানকির ছেলে। একটা চড়ে তোর ৩২ টা  দাঁত ফেলে দেবো। শুয়োরের বাচ্চা। "

আমার চাপা তীব্র আগ্রাসি হুংকারে সে ভয় পেয়ে গেল।  পরক্ষণে সে একজনকে ব্যাকুল ভাবে   ডাক দিল। যেন তার উদ্ধার কর্তা এসে গেছে। স্টল মালিক আবার যুদ্ধ করার জন্য গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো। ভাব দেখে মনে হচ্ছে, সে এবার আমাকে হাতে টিপে মেরে ফেলবে।  অথচ তার উদ্ধার কর্তা এসে আমার সাথে হাত মিলালো। 
বলল, "কিরে তুষার, দুপুর বেলায় মেলায় কেন? "

"না ভাই এমনি। সাথে একটা গেস্ট  আছে তো। তাকে মেলা দেখাতে নিয়ে আসলাম। "

"কই, কে? "

আমি রাশমিনকে দেখালাম। 

"কিছু খেতে দিয়েছিস? না এমনি এমনি বসিয়ে রেখেছিস? "

"না, ও খেতে চায় না। "
" কি বলছিস পাগল? তোর গেস্ট তো আমারও গেস্ট। চল তোর গেস্টের সাথে পরিচিত হই। "

আমি পরিচয় করিয়ে দিলাম। 
"রাশমিন এই হচ্ছে মাসুম ভাই। ভাই,এ  হচ্ছে আমার খালাতো বোন রাশমিন। "

রাশমিন মাসুম ভাইকে সালাম দিল। 
মাসুম ভাই বলল, "ভালো আছিস? "

তারপর সে নিজেকে একজন প্রথম শ্রেণীর কন্ট্রাক্টর হিসেবে পরিচয় দিলো। শেষে বলল, "ঠিক আছে,  তোরা বসে গল্প কর আমি একটু ব্যস্ত আছি।"

মাসুম ভাই চলে গেল। স্টল মালিক আমাদের জন্য নিজের হাতে চা নাস্তা নিয়ে এলো।রাশমিন কিছু খেলো না।   আমি চা এবং নাস্তা খেলাম। আসার সময় স্টল মালিক বলল,"ভাই আবার আসবেন।  আমাদের একটু দেখে শুনে রাখবেন। "

পানির দাম তো নিলই না আরো চা-নাস্তা খাওয়ালো। আমি মনে মনে হাসলাম। একেই বলে ঠেলার নাম বাবাজি। 





আসলে আমার নাস্তা দেওয়ার কথা মাসুম ভাই বলে গেছে। মাসুম ভাই প্রথম শ্রেণীর একজন কন্ট্রাক্টর। কিন্তু এখনো সে হোটেলে খেয়ে  টাকা দেয় না। তার টাকার অভাব নেই কিন্তু দেয় না। প্রভাব দেখানো আর কি। তার কথায় এই এলাকায় বাঘে- মহিষে এক ঘাটে জল খায়।  দোকানদার বুঝেছে মাসুম ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্কটা কি। এখন থেকে দেখা হলেই এ সালাম দিবে। 

রাশমিন ফট করে উঠে দাঁড়ালো। আমি তাকে অনুসরণ করলাম। আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটা গেঞ্জির দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। এই দোকানে শুধু গেঞ্জি। গলা ছাড়া, গলা সহ, হাফ হাতা স্যান্ডো গেঞ্জি, হাতের কাজ করা বিভিন্ন কোটেশন লেখা। কোন কোন গেঞ্জিতে  সরাসরি লেখা আই লাভ ইউ। 


রাশমিন খুঁজে খুঁজে একটা গেঞ্জি  বের করল। তাতে লেখা,
For god sake 
Hold your tongue
and let me love.

হাফ হাতা  ক্রিম কালারের গেঞ্জি।তাতে হাতের কাজ করা। গেঞ্জিটাকে দারুন লাগছে। রাশমিনের  পছন্দ আছে বলতে হবে। রাসমিন গেঞ্জিটা আমার গায়ে ধরে মাপ নিল। দোকানদারকে বলল , "চলবে প্যাকিং করে দেন।" 

অনেক দামী গেঞ্জিটা। রাশমিন হাঁটতে হাঁটতে  বলল, আমার এক বন্ধুর জন্য কিনলাম। 

এতক্ষণ মনটা উড়ছিল। তার কথা শুনে সেটা দেবে বসে গেল। কে সেই ভাগ্যবান বন্ধু? মনের ভিতরে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক  খাচ্ছে। চোখে অন্ধকার দেখছি। রাস্তায় পা ফেলে হাঁটছি, না আকাশে পা ফেলে হাঁটছি বুঝতে পারছি না। আমি এমন ভাবিনি যে, এটা আমাকে দেবে। ভেবেছিলাম, হয়তো বাড়ির কারো জন্য কিনেছে। কিন্তু এখন দেখছি, ভালোবাসার কথা লেখা  গেঞ্জি উপহার দেওয়ার মতো বন্ধু তার আছে।যাকে ভালোবাসার কথাটি গুছিয়ে  বলার জন্য তার বিস্তর অবসর প্রয়োজন  । অথচ আমি একে নিয়ে কত আকাশ কুসুম  কল্পনা করেছি। 

যশোর টাউন হল ময়দান থেকে ধর্মতলা বড়জোর ২ কিলো পথ। অথচ এই পথকে  মনে হলো যেন হাজার বছরব্যাপী দীর্ঘ  এক অন্ধকারময় পথ। এ পথের যেনো শেষ নেই।অনেক  কষ্টে পথটা পেরিয়ে এলাম।

কখন রাশমিন বাসে উঠে চলে গেছে কিচ্ছু  মনে নেই। আমি যাত্রী ছাউনির ভিতরে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হাতের জ্বলন্ত সিগারেট কখন নিভে গেছে টের পাইনি। টানতে যেয়ে দেখি শুধু পানি। চোখের পানিতে কখন যে সিগারেট ভিজে নিভে গেছে বুঝতে পারিনি। 


 



কতক্ষণ পরে জানি না,  একসময় মনে হলো, আমার ডান হাতে কিছু একটা- ভারি কিছু আছে। আরে এ যে সেই গেঞ্জির প্যাকেট। রাসমিন ভুলে প্যাকেট আমার কাছে রেখেই চলে গেছে। এখন আমার কী করা উচিত? প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করলাম। ধরালাম। সিগারেট কিরকম পানসে পানসে লাগছে, স্বাদ নেই। সিগারেট টানছি না শুধু কাগজ পুড়িয়ে ধোঁয়া নিচ্ছি বোঝা যাচ্ছে না। কয়েক টানেই সিগারেট শেষ। রিকশায় উঠে আর একটি ধরালাম। রাসমিনকে ফোন দিলে কেমন হয়? হ্যাঁ তাই করা যাক। 

মোবাইলের কি গুলো চেপে রাশমিনের মোবাইলে কল দিলাম। 

"রাশমিন?"
"হ্যাঁ, কি মনে করে? "
"তোমার গেঞ্জিটা তো ফেলে গেছো।"
"কোথায়? "
"এই যে আমার হাতে। "
"আপনি কোথায়? "
"গোরস্থানে। "
"মানে? "
"মানে রিক্সায় করে হলে যাচ্ছি,। "
"কিন্তু গোরস্থানে কেন? "
"আমি এখন কারবালা গোরস্থান পার হচ্ছি। "
"ও, তাই বলেন, আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। "

ওপাশ থেকে মোবাইলে হাসির সুবাতাস বয়ে এলো। 

" তোমার গেঞ্জিটা কি তৌফিক কে দিয়ে পাঠিয়ে দেবো? "

"না। "
"না কেন? "
"কেন ওটা কি খুব ভারী? আপনার বয়ে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে? "
"না মানে। "
"আপনার পছন্দ হয়নি? "
"কিন্তু? "

ওপাশের সেট টা অফ হয়ে গেল। অনেকবার চেষ্টা করেও আর রিং ঢোকানে গেল না। 

ভালোবাসা ভালো নয় এ কথা জানে সবাই। তবু কেন বোঝে না হৃদয়? 





(১৯)




আজকের এই রাত শুধু রাত নয় এক রহস্যময় অধ্যায়। আকাশে অনেক তারা চাঁদের কোন চিহ্ন নেই। আমি একা বসে আছি ডাইনিং এর বিশাল ছাদের উপর। এত ছাদ নয় যেন ঘোড়দৌড় মাঠ। আমার সামনে, উত্তরে - ছাদের কোল ঘেষে বিশাল বিশাল সেগুন গাছ। মাথা ঝুঁকিয়ে নীরব হয়ে আছে তারা। এই ছাদ, এই গাছ, এই রাত ওই আকাশের তারা সবারই প্রাণ আছে। কিন্তু কী এক অজানা  কারণে সবাই চুপচাপ হয়ে আছে। তারা যেন আজ আমাকে কিছু বলি বলি করেও,না বলে থেমে আছে। 
আমার সমস্ত চাওয়া পাওয়া গুলো আজ এক দফাই পরিণত হয়েছে। হয় রাশমিন, না হয় মৃত্যু। সমস্ত পৃথিবী সুখের ঘুমে ডুবে গেছে। ঘুম নেই শুধু আমার চোখে। আজ সব ফয়সালা হয়ে যাবে। 

- আল্লাহ, তুমি রাশমিনকে আমার করে দাও। ও আমার স্রষ্টা, তুমি কি আমার হৃদয়ের হাহাকার শুনতে পাচ্ছ?স্রষ্টা কিসে তুমি সন্তুষ্ট হও? আমি তা জানি না।কিন্তু তুমি তো জানো কিসে তোমার সৃষ্টি ব্যাথা পায়, বিনষ্ট হয়, ধ্বংস হয় তার জীবন? আমি আজ বড় কাঙ্গাল। এই পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আমার আর কোন সাহায্যকারী নাই। তুমি সবচেয়ে বড় দয়ালু, তুমি সবচেয়ে বড় বন্ধু। ও আমার স্রষ্টা রাসমিনের মন আমার প্রতি ভালবাসায় পূর্ণ করে দাও। সে যেন আমাকে ভালোবাসে, আমাকে আপন করে নেয়।আমার ব্যথা যেন অনুভব করতে পারে। স্রষ্টা তুমি সব পারো আমারে চাওয়া তুমি পূর্ণ করে দাও। রাশমিনকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। 

মনের অজান্তে কখন যে কাঁদতে শুরু করেছি। সমস্ত শার্ট চোখের পানিতে ভিজে গেছে। পকেটে এক প্যাকেট সিগারেট ভিজে দলা পাকিয়ে গেছে। কান্না থামছে না। কিছুতেই কান্না থামানো যাচ্ছে না। দু চোখ দিয়ে শুধু পানি ঝরছে। অথচ বাড়ির সবাই বলে, আমি নাকি খুব নিষ্ঠুর।ছোটবেলায় আমার একটি বোন বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলো।সে আমাকে খুব ভালোবাসতো। সব সময় কোলে পিঠে করে নিয়ে বেড়াত। অথচ তার মৃত্যুতে আমি এক ফোঁটাও চোখের পানি ফেলিনি। অথচ আজ আমি নির্লজ্জের মত, ফকিরের মত, পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় একজন ব্যক্তি হিসেবে স্রষ্টার কাছে চোখের পানির বিনিময়ে একটি মেয়ের ভালোবাসা ভিক্ষে চাচ্ছি। 

হাই আমি একি করছি। আমি রাশমিনকে এত ভালবেসে ফেলেছি? শুধু ভালোবাসা নয় পাগলের মত অবস্থা দাঁড়িয়েছে আমার । তাকে না পেলে হয়তো আমি সত্যি সত্যিই রাস্তার পাগল হয়ে যাব। 

তার সবকিছু বড় রহস্যময়। আমি কেন তাকে এত ভালোবাসলাম? আজো আমি তার মুখটাই তো দেখতে পারিনি। শুধু বোরকার ফাঁকে দুটো চোখ দেখেই এই অবস্থা। তার পুরো মুখটা দেখতে পেলে তখন না জানি আমার কি অবস্থা হবে। ভাবতে ভাবতে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে রাত শেষ হয়ে গেছে বুঝতে পারিনি। কখন যে ভোর হয়ে গেছে কিচ্ছু বুঝতে পারিনি। মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ফজরের আজান, আল্লাহু আকবার - ভেসে আসছে।সম্বিত   ফিরে পেয়ে দেখি, এই বিরান ছাদে একা একা সারাটি রাত বসে বসে কাটিয়ে দিয়েছি। শিশিরে মাথা টাথা ভিজে একাকার কাথা কাথা। ঠান্ডায় গলা বসে গেছে। শার্টটাট ভিজে একাকার  অবস্থা। 


তাড়াতাড়ি রুমে ফিরে মাথাটাথা মুছে সমস্ত ড্রেস চেঞ্জ করে ফেললাম। এখন কি রকম শীত শীত করছে, জ্বরের লক্ষণ বলে মনে হচ্ছে। শুকনো কাপড় পরে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। 

    



কোন স্বর্গলোক থেকে একটু করে শান্তি নেমে এসেছে কপালের উপর। শান্তিটুকু কপাল থেকে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। সুখ সুখ আরাম আরাম অনুভূতিতে সমস্ত  শরীর এলিয়ে আসছে। টুংটাং গিটারের শব্দ কানে আসছে। গিটারে একটা গান বাজছে-  তুমি তাই, তুমি তাই গো, আমারো পরানো যাহা চাই।

সিগারেটের গন্ধ, একটি মেয়েলী কন্ঠ।আমি কি ঘুমিয়ে আছি না  জেগে আছি, বোঝা যাচ্ছে না। আমার চোখ দুটো বন্ধ-  কিন্তু দেখতে পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি অথচ বলতে পারছি না। এইতো, আমি বেশ বুঝতে পারছি। আমার পাশেই রাশমিন বসে  আছে। বুঝতে পারছি, বোঝাটা ভুল বোঝা।  আর রাতের বেলায় ছেলেদের হলে কোন মেয়ের উপস্থিতি তো কল্পনাতেই সম্ভব। 


কিন্তু আমি যেন শুনতে পাচ্ছি,রাশমিনের রিনিঝিনি কন্ঠ, " ওহ!  এতো অনেক জ্বর,জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। "

আমি নিজের মনেই প্রশ্ন করছি, 
"কার জ্বর, কার জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে? মেয়েলি কন্ঠটাই বা কার? কপালের এই সুখটাই বা কিসের? তুলোর মতো নরম সুখ। আস্তে আস্তে নিজের হাতটা কপালের উপর রাখলাম। একি আমার হাতের নীচে! এত নরম মোলায়েম হাতটি কার? আমার এত ভালো লাগছে কেন? এ কি স্বপ্ন? হতে পারে। প্রয়োজন নেই এর সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের। যদি স্বপ্নে এই ভালোলাগা এসে থাকে তবে স্বপ্ন আরও দীর্ঘ হোক। "

আমি জোর করে চোখ দুটো আরো এঁটে ধরলাম। এই স্বপ্ন যেন কিছুতেই না ভেঙে যায়। চোখ জোর করে এঁটে ধরার পর আস্তে আস্তে চোখ খুলে গেল। জলপদ্মের দারুন ফুরফুরে সুবাসে বুকটা ভরে গেল। এই গন্ধটা তো রাশমিনের  শরীরের। 

না স্বপ্ন নয়।আমার শিয়রে রাসমিন বসে।  তার একটা হাত আমার কপালে। আনন্দে আমার দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে  পড়তে লাগলো। 

তারমানে কাল রাতের প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেছে। 

রাশমিন কষ্ট কষ্ট স্বরে প্রশ্ন  করল, 
" কী করে জ্বর বাধালেন? "
"কই? "
"আপনার শরীরে তো অনেক জ্বর। "
"তুমি কখন এলে? "
"প্রায় এক ঘন্টা। ঘুমের ভিতর বিড়বিড় করে কি বকছিলেন? "
"এক ঘন্টা এসেছো? এত সময়? "
"হ্যাঁ, এখন সকাল দশটা বাজে। জ্বরে তো গা পুড়ে যাচ্ছে । "
"জ্বর, আমার? "
" না তো আমার? কাঁদছেন কেন? "
"কই, না তো আমি? চোখে   মনে হয় কিছু পড়েছে। "

রাশমিন কণ্ঠে  কিছুটা কৃত্রিম বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল  , "না ,কিচ্ছু পড়েনি। পড়বে কখন? এতক্ষণ তো চোখ বন্ধ করে ঘুমাচ্ছিলেন। "

তার কথায় যুক্তি আছে, আমি পরাজয় স্বীকার করে বললাম , "তাহলে মনে হয় কাঁদছি। সে যাক তুমি মনে হয় কোন কাজে এসেছিলে। "

রাশমিন বোরকার ফাঁকের  চোখ দুটিতে একটু হাসলো। তারপর মিহি কন্ঠে বলল,  "হ্যাঁ, আমার ছবি আর কাগজ পাতি গুলো সত্যায়িত করতে হবে। প্রাইমারি স্কুলে একটা দরখাস্ত করব। আপনি করবেন না? "

"সহকারী শিক্ষক? "
" হ্যাঁ। "
"আমি করেছি।চলো তোমার  কাগজপত্র সত্যায়িত করে নিয়ে আসি।"





"আরে, আরে উঠছেন কোথায়? আপনি তো অসুস্থ।"
 
তার আহত কন্ঠ আমার খুব ভালো লাগলো। হয়তো কালকে রাতের প্রার্থনা কবুল হয়ে গেছে। আজ সে আমার ব্যথায় ব্যথিত হচ্ছে।

"  কলেজে যেতে হবে না? সময় তো বেশি নেই।"

"না থাক আপনি শুয়ে থাকেন। কাল পরশু একসময় সত্যায়িত করলেও চলবে।"

"  আচ্ছা ঠিক আছে। আগে হাত মুখ ধুয়ে  ফ্রেশ  তো হই। "

ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে বাথরুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম। মাথার ভেতর কেমন চক্কর মেরে উঠলো। পড়ে যাচ্ছিলাম। রাশমিন ধরে ফেলল।

"থাক, আপনি বসেন। আমি পানি এনে দিচ্ছি। রুমে বসে হাত মুখ ধুয়ে নিন। "

"আরে না, না।"

 রাশমিনের চোখেমুখে উদ্বিগ্নতা। আমার খুব ভালো লাগছে। 

আয়নায় নিজেকে দেখলাম, চোখ দুটো লাল জবা ফুলের মত হয়ে গেছে। তার মানে শরীরে অনেক জ্বর। জ্বর তুমি আরো দুটো দিন থাকো। যেন চট করে চলে যেও না। প্রতি সকালে রাশমিন এসে  ঘুম ভাঙাক। তার নরম হাত স্পর্শ করে প্রতি সকলে জেগে উঠি। 

ড্রেস পরছি রাশমিন বললো, "নাস্তা করবেন না?"

"  নাস্তা?ডাইনিং এ যেতে ইচ্ছে করছে না। "

"ঠিক আছে আমি এনে দিচ্ছি। "

" আরে না না কি বলছো তুমি? "

আমাদের কথার মধ্যে শাহানুর এসে হাজির। সে বলল, "আরে ভাই, আমরা তো আছি। আপনি অসুস্থ মানুষ আপনি বসেন। আমি নাস্তা এনে দিচ্ছি। "

গ্যাভাডিনের প্যান্টের সাথে ফুল হাতা স্ট্রাইপের   শার্ট পরে ইন করলাম। রাশমিন কী পরেছে বোঝার উপায় নেই। তার সমস্ত শরীর মুখ বোরকাই ঢাকা। কালো রঙের বোরকা, স্কিন ও না আবার লুজও না। তার শরীরের সাথে দারুণ ম্যাচ করেছে। আজকাল মেয়েরা তো বোরকা পরার নামে নিজেকে একরকম উলঙ্গ ভাবে নিজেকে ছোলা কলার মত প্রদর্শন করে। পেছনে বোরকা পাছার সাথে এটে থাকে। সম্পূর্ণ স্ট্রাকচারটা তীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলে, সামনেও একই অবস্থা। উগ্রতার এক শেষ।  এটা ছেলেদের আবেগীয়ভাবে ব্লাকমেইলিং এর একটা ফাঁদ। কিন্তু রাশমিনের বোরকার ভিতর একটা মার্জিত পরিছন্নতা রয়েছে। 

রাশমিন বলল, "আপনি রেডি?"

"হ্যাঁ, চলো। "

"সেই গেঞ্জিটা কই?"

" বক্সের ভিতরে। "
"বের করেন।"

তাহলে কি সে গেঞ্জিটা নিয়ে  যাবে? আমার মুখ  মুহূর্তের ভেতর রক্তশূন্য পাংশু হয়ে গেল। রাশমিন কিরকম রসকসহীন স্ট্রেট কথা বলছে।হায়! আমাকে নিয়ে তুমি এ কি নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছ । তোমাকে ভালোবাসি বলেই কি এইভাবে আঘাত  করছো? মনেপড়ে গেলো ছোটো বেলার সেই  গল্পটার কথা।  ছেলেরা পুকুরে খেলার ছলে ঢিল ছুড়ছে।  ব্যাঙগুলো চিৎকার করছে, দোহাই তোমাদের, এই ভাবে আর ঢিল ছুড়ো না। তোমাদের জন্য যা খেলা আমাদের জন্য তা মরণ। 

আর আজ আমার বুকের গভীরে বারবার একটি কথাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, রাশমিন , আমাকে নিয়ে তুমি এইভাবে খেলো না। তোমার জন্য যা খেলা আমার জন্য তা মৃত্যু। তুমি জানো না, আমি তোমাকে কতটা ভালবেসে ফেলেছি। তুমি যদি আমার বুকে ছুরিও চালাও তা আমি হাসিমুখে  বরণ করে নেব।

 গেঞ্জির প্যাকেটটা বের করে তার হাতে দিলাম। বললাম,চলো।

"দাঁড়ান। "
"কেন?"
" শার্ট খোলেন।"
" কী বলছো।"
"খোলবেন তো। "

শার্ট খুললাম। অবাক হয়ে দেখলাম, রাশমিন নিজ হাতে গেঞ্জিটা আমার গায়ে পরিয়ে দিচ্ছে। এই ফাগুনিত সময়ে কথার কুসুম ফোটানো দরকার। কই তারা? কাউকে খুজে পাচ্ছি না।অথচ কত কথা বলার দরকার।সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তে  মানুষ বুঝি এরকম বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। 

রাশমিন বলল, "সু খোলেন।"
"কেন?"



"দেখেন না স্যান্ডেল পরে ইন করলে কেমন ক্ষ্যাত ক্ষ্যাত লাগে? আবার গেঞ্জি পরে সু পরলেও কেমন ক্ষ্যাত ক্ষ্যাত লাগে। স্যান্ডেল পরেন। "

পরলাম স্যান্ডেল। 

রাসমিন একটা আনন্দের হাসি দিয়ে বলল, "এইতো ফাইন হয়েছে চলেন। "




(২০)





পর্দা সরিয়ে রুমে ঢুকেই বুঝতে পারলাম, ঢোকা উচিত হয়নি। না জানি কি হয়। রাশমিন রয়েছে সাথে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টে আর কোন স্যার নেই। শুধু রহিম স্যার আছে। না জানি আজ আবার কি ফ্যাসাদ বাঁধে।

 শরীরটা ভালো না তাই তিন তলার বাংলা ডিপার্টমেন্টে যেতে ইচ্ছে করলো না। দুই তলায় সিঁড়ির মাথায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্ট। ভেবেছিলাম, কম কষ্টে কাজ সেরে চলে যাব কিন্তু তা মনে হয় হবার নয়।

মনে পড়ে গেল মাধুরীর কথা:
 সেদিন ছিল ভর্তির লাস্ট ডেট। মাধুরী ভর্তি হবে।সে চান্স পেয়েছে। এসএসসির কাগজ পাতি এনেছে।কিন্তু ইন্টারমিডিয়েট এর কাগজ পাতি গুলি আনতে ভুলে গেছে।  সেগুলো ছাড়া তো ভর্তির প্রশ্নই আসে না। আবার আনার সময়ও নেই যে, সে বাড়িতে যেয়ে নিয়ে আসবে। মাধুরীর চোখে মুখে তখন পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার নেমে এসেছে। সে পাগলের মত হয়ে গেছে। যাকে পাচ্ছে তাকে ধরে তার সমস্যার কথা জানাচ্ছে। সবাই জানিয়ে দিয়েছে, সে আর ভর্তি হতে পারবে না। একটি ভুলের জন্য ভর্তি থেকে সে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে। দুঃখে কষ্টে যন্ত্রণায় তৌফিকের সামনে সে সমস্যার কথা জানালো। তৌফিক মাধুরীকে আমার কাছে নিয়ে এলো। আমি তাকে রহিম স্যারের কাছে নিয়ে গেলাম। তখন ভর্তি প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। স্যার শিক্ষক লঞ্জে বসে ভর্তির কাগজ পাতি গুলো গোছাচ্ছে। বললাম, "স্যার, মাধুরীকে ভর্তি করতে হবে।"


স্যার টাক মাথায় ডান হাত টা একটু ঘসলো। একটু হাসলো। তারপর বলল, "এখন তো সময় নেই। সময় শেষ হয়ে গেছে। "

আমি দৃঢ়ভাবে বললাম," স্যার,  এ আমার বিশেষ  পরিচিত। "

"আচ্ছা, ঠিক আছে, কাগজ পাতি দাও। "

কাগজপত্র দিলাম। চাঁদ দেখেশুনে টান দিয়ে সব আমার মুখের উপর ছুড়ে মারলেন। রেগে বললেন, "ইন্টারমিডিয়েটের কাগজপত্র কই?দাও। "

আমি আমি বিনীতভাবে বললাম, ওগুলো তো নেই। থাকলে তো সকালে ভর্তি হয়ে সে বাড়ি চলে যেত। 

স্যার হুংকার দিয়ে বললেন, "যাও এখান থেকে। "

স্যার তীব্রভাবে অপমান করে আমাকে তাড়িয়ে দিতে চাইলেন। আমি দাঁতে দাঁত চেপে অনেক কষ্টে রাগ হজম করে কাগজপত্রগুলো ফ্লোর থেকে  কুড়িয়ে নিলাম। তারপর স্যারকে আমার বিনীতভাবে বললাম, একটা সুযোগ দেন স্যার। মেয়েটার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। 

আরো অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকে দেখে বলল,"ঠিক আছে  এগুলো রেখে যাও।কালকে বাকি কাগজপত্র নিয়ে এসো। "


মাধুরী পরের দিন তার সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে এলো।ভর্তি হলো ক্লাস করতে লাগলো। একদিন কি একটা কাজে মাধুরীর ডিপার্টমেন্টে গিয়েছি,ওর সাথে মুখোমুখি দেখা। সে আমার দিকে এক নজর তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। এমন ভাব করলো যেন সে  জীবনে কখনো আমাকে দেখেনি।অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম। 

পুরনো কথা থাক। 

আজকের কথা বলি। 

স্যারকে সালাম দিলাম। স্যার ঝুকে বসে পত্রিকা পড়ছিল। ঝুকেই থাকলো। কোন নড়াচড়া নেই। আমি যেন কেউ না। রুমে যেন কেউ ঢোকেনি। কেউ যেন তাকে সালাম দেইনি। কিন্তু ঢোকার সময়েই আড়চোখে  আমাকে দেখেছে। এখন দেখেও না দেখার ভান করছে। এ এক ধরনের ভাব নেওয়া আর কি। 

"স্যার একটু কথা বলতাম।"
" হ্যাঁ, বল।"
" স্যার,এই কাগজপত্র গুলো সত্যায়িত করতে হবে স্যার।"

" দেখি। "

রাশমিনের কাগজপত্র,  ছবি স্যারের সামনে টেবিলে মেলে  ধরলাম। স্যার আগে ছবিগুলো হাতে নিয়ে ভালো করে দেখলো উল্টোপিঠে নাম লেখা আছে কি-না। নাম লেখা আছে। একটা ঢোক চিপলেন। স্যার কম ঘড়েল মাল না। হ্যারাজ করার জন্য বললেন, "এ ছবি কার? "
 রাশমিন বললো, "এ ছবি আমার। "
"মুখ খোলো। "

আমি রাশমিনের দিকে তাকালাম। মনে হয় না সে মুখ খুলবে। তবে রাশমিন যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসি দিলো তাতে মনে হল সে মুখ খুলবে কিন্তু আমার জন্য লজ্জা পাচ্ছে। তাহলে কি আমি বাইরে যাব? না তা হয় না। এত সুন্দর একটা সুযোগ অযাচিত ভাবে পেয়েও তাকে হেলায় হারানো যায় না।রাশমিন তার মুখের বোরকা সরাতে শুরু করল। আমি লুব্ধ  দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলাম। 





রাশমিন মুখের বোরকা সরিয়ে ফেলেছে। একটা লাজুক হাসি তার স্বপ্নময় মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। স্যার হা করে তাকিয়ে আছে চশমার ফাঁকে। আমি যেন নতুন করে জন্ম লাভ করেছি পৃথিবীতে। 


কি অপরূপ রূপ আমি দেখছি। শুধু দেখছি। এত সুন্দর মুখ এর আগে কখনো দেখিনি, তাই তুলনাও খুঁজে পাচ্ছিনা। শুধু একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছে, একে তো আমি চিনি। জন্মের পূর্ব থেকেই চিনি। সে তো আমার আপন। একে খুঁজে বের করার জন্যই তো আমার পৃথিবীতে আসা। এইতো আমার জীবন,  এইতো আমার মরণ। এইতো জন্মের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছি। আর কোন লুকোচুরি নয়। হৃদয়ের সমস্ত কথা আজ উজাড় করে দিতে হবে। বলতে হবে, রাশমিন, তুমি আমার, শুধুই আমার। শুধু আমার জন্যেই তুমি পৃথিবীতে এসেছ , আর আমি তোমার জন্যেই জন্মেছি। আমার হাতে হাত রাখো। জন্ম আমার সার্থক কর। 

চশমার ভেতর থেকে চিকন করে স্যার তাকালেন।বললেন,"এই ছবি যে তোমার  তার কোন প্রমাণ আছে?"

 স্যারের প্রশ্ন শুনে আমি থ হয়ে গেলাম। স্যার বলে কী? রাশমিনের  ছবি স্যারের হাতে, রাশমিন স্যারের সামনে।এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী আছে? একজন অন্ধও তো বলে দিতে পারবে, এ ছবি কার ।আর।আর এ ৪ চোখ দিয়ে দেখেও বলতে পারছে না এ ছবি কার।এর কী উত্তর দেব? উত্তর আমাকে দিতে হলো না, উত্তর দিলো রাশমিন। 

" এই ছবি যে আমার না তার কোন প্রমাণ আছে?"

বাহ! রাশমিন কিন্তু বেশ কথা জানে।আমার মাথায় তো একথা আসেনি।

স্যার কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন। একটা ঢোক চিপলেন।স্যার কম  ঘড়িয়াল না। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বললেন,অন্য যে কারোর ছবিও তো হতে পারে? 

আমার মেজাজ বিগড়ে গেল। মেজাজ বিগড়ে গেলে আমার স্থান-কাল পাত্র জ্ঞান থাকে না। আর এ এখন পা পাড়িয়ে গ্যাঞ্জাম বাধাতেই  চাচ্ছে, একে আর ছাড়া যায় না। মাথাটা গরম হয়ে গেল। দুম করে মুখের উপর বলে বসলাম, "স্যার, ওটা অন্য কারোর ছবি নয়। আপনি চিনতে পারছেন না? ওটা আপনার বাপের ছবি। "

স্যার মনে হয় বুঝলেন যে, আমি কোন দিকে যাচ্ছি। আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে, কিছুটা নরম হয়ে- বললেন, "মেয়ে মানুষ কখনো বাপ হয়?"

" ও, তাহলে বুঝতে পেরেছেন যে, ওটা মেয়ে মানুষের ছবি? চার চোখ দিয়ে দেখছেন তো, তাই অসুবিধা হচ্ছে । চশমাটা খোলেন দেখবেন ঠিকই বুঝতে পারছেন ওই ছবি রাশমিনের। নেন সই করেন। "

"তোমাদের মত ছাত্র নেতাদের জন্যই চাকরি করা কষ্টকর। "

আমি এতক্ষন এই আশঙ্কায় করছিলাম।রাশমিনের  সামনে আমার পরিচয় ফাঁস হয়ে গেল। আমি ফ্যাকাসে মুখে রাশমিনের দিকে তাকালাম। রাশমিন আমার দিকে তাকিয়ে শুধু একবার চোখের পলক ফেলল। কী এর অর্থ? কিছুই বুঝলাম না। পরিচয় প্রকাশ যখন হয়েই গেছে লুকানোর চেষ্টা করে আর লাভ নেই। স্যারকে ধমকের সুরে বললাম, "কষ্ট হলে চেয়ার ছেড়ে দেন। বয়সতো বেশ হয়েছে। খালি জায়গা পূরণ করার জন্য অনেক যোগ্য লোক অপেক্ষায় আছে। খামোখা জঞ্জাল বাড়াচ্ছেন কেন?"

স্যার মিনমিন করে বললেন, "আমি  সই করব না। "
" সই আপনাকে করতেই হবে । "
" না আমি সই করব না। "

আমার রুদ্র মূর্তি দেখে কথা বলতে বলতে  আস্তে করে উঠে  ভয়ে ভয়ে বাথরুমে ঢুকে দরজা দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন।

রাশমিন একটু শুকনো হাসি হেসে বলল," স্যার ইচ্ছা করে এই শয়তানিটা করলো।"

রাগে আমার সমস্ত শরীর তখনও দপদপ করে জ্বলছে। বললাম, "তুমি কিভাবে বুঝলে? "

কাগজ পাতি গুলো টেবিল থেকে গোছাতে গোছাতে রাশমিন বলল, "স্যারকে আমি চিনি। স্যারও আমাকে চেনে। "

আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, " কিভাবে? "

"আমি তো পজিট্রন কোচিং সেন্টারে মেডিকেলের জন্য কোচিং করতাম। সেখানে জিল্লুর বারী স্যার কেমিস্ট্রি ক্লাস নেয়। রহমান স্যার জিল্লুর বারী স্যারের বন্ধু। সেখানে যায়। "

আমি বললাম, জিল্লুল বারি স্যার তো আমাদের অপজিট পার্টি করে। 
"রহমান স্যারও তাই।"
"তাই?"
"হ্যা।"

আমি যেন গাছ থেকে পড়লাম। যেসে পড়া নয়, দাঁত মুখ ভেঙে পড়া। এর পেছনে দুটো কারণ আছে। 
১। রাশমিন মেডিকেলে কোচিং করতো, অথচ জাতিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য দৌড়ঝাপ করছে। 
২।রহমান স্যার যে দল করে তা আজ জানলাম। 
আসলে জানবো কী করে? সরকারি কলেজের স্যাররা তো সরাসরি দল করে না। করে মনে মনে। এ তো আর স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়।পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যারেরা  সরাসরি মিছিল মিটিং করে। সেও ভালো। কিন্তু এখানে তো চেনার উপায় নেই । 

আজ বুঝলাম, রহমান স্যার কেন আমার সাথে খারাপ আচরণ করে? আমি তার বিপরীত দল করি।এটাই কি আমার দোষ?  এই কি ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক?

 কথা বলতে বলতে আমরা তিন তলায় চলে এলাম।

রাশমিন বলল, "থাক চলেন। সত্যায়িত করার দরকার নেই।"

 "কেন? "
"আরে,  আপনাদের এই সমস্ত ফাস্ট ক্লাস  গেজেটেড অফিসার স্যারদের ফুটপাতে ২০-২৫ টাকায় কিনতে পাওয়া যায়। "
" কিরকম? "

"কেন, ২০-২৫ টাকা দিলে  দিব্বি এদের সিল তৈরি হয়ে যাবে। আর সই নিজে নিজে করে ইচ্ছেমতো সিল মারবো।কে দেখতে আসছে? "

রাশমিনের চোখে মুখে এখন বুদ্ধিদীপ্ত হাসি ছড়িয়ে আছে। সে শব্দ করে হেসে উঠলো। হাসিতে তার সমস্ত শরীরে একটা দোলা খেলা করে গেলো।কি চমৎকার করে রাশনিন হাসতে পারে। 


  আমি বললাম, "সেটা তো নকল হয়ে গেল।"


"  হোক নকল। আপনাদের এই দেমাগওয়ালা স্যারদের কাছে তো আর আসতে  হলো না।"

রাশমিনের কন্ঠে তীব্র ক্ষোভ।

 আমি বললাম, "তা অবশ্য ঠিক। এদের এই বাড়াবাড়ির জন্য, এই ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য-  এদের শেষমেষ ২০/২৫ টাকায় ফুটপাতে নামতে হয়েছে। "

তারপর থেমে বললাম," শোনো। সব স্যার এক রকম নয়। চলো তার প্রমাণ দেব। "

বাংলা ডিপার্টমেন্টের সহজেই কাজটা হয়ে গেল। প্রথমে বাংলা ডিপার্টমেন্টে এলে এত ঝামেলা করা লাগত না।






(২১)





 আমি তোমাকে ভালোবাসি।

 কিভাবে এই কথাটা বলা যায়? কিভাবে এই কথাটা বলা যায়? কত গল্প, কত উপন্যাস, কবিতায়  ভালোবাসার কত কথা আছে। কিভাবে বলতে হয় তাও বলা আছে। কিন্তু বলতে গেলে যখন হার্টবিট বেড়ে যায়, গলা আটকে আসে তখন কী করতে হয় তা বলা নেই। আমার মত এইরকম পরিস্থিতিতে কখনো কেউ কি পড়েছে? কিন্তু সময় তো চলে যাচ্ছে। এখনই সময় ভালোবাসার কথাটি বলে ফেলার। 

সময় গেলে সাধন হবে না। এই সুযোগ কি আর কখনো আসবে? আসবে না। যেভাবেই হোক আজ বলতেই হবে, রাশমিন, আমি তোমাকে ভালোবাসি। 

আমরা বসে আছি মহিলা হোস্টেলের দিকে পেছন ফিরে, গাছের শিকড়ের উপর। গাছটির অসংখ্য শেখড় পানির উপর ঝুলে আছে। এতদিন দেখেছি, শহীদ আসাদ হলের সামনের পুকুরের উপর ঝুঁকে  থাকা এই গাছের শিকড়ের উপর জোড়ায় জোড়ায় ছেলে মেয়েরা বসে গল্প করে, বাদাম খাই-  ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটায়। কত দেখেছি, কত ভেবেছি,  কত আফসোস করেছি। আজ আমার একটি স্বপ্ন পূরণ হল, কিন্তু সবকিছু  তো বাকি থেকে গেল। আজ আমি  কেন বলতে পারছি না, রাশমিন আমি  তোমাকে ভালোবাসি। 

মনের মানুষটাকে তো এখনো আপন করে পেতে পারলাম না। শঙ্কা মুক্ত হয়ে মনের কথাটা বলতে পারলাম না।
বাদাম চিবাতে চিবাতে রাশমিন বলল, " কি ব্যাপার তুষার ভাই, আপনি এত ঘামছেন কেন? "

"আমি, ঘামছি, কই? "

কপালে হাত দিয়ে দেখি ঘামে কপাল ভিজে জবজবে হয়েগেছে।  একটা ফ্যাকাশে হাসি হাসলাম। রাশমিন মিটমিট করে হাসছে। তারমানে সে কি আমার অবস্থা বুঝে ফেলেছে? বুঝতে পারে, বুঝুক। পরিস্থিতি সামলে বললাম, "আচ্ছা, তুমি মেডিকেলে ভর্তির জন্য কোচিং করছো, অথচ জাতীয়বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য দৌড়ঝাঁপ করছে কেন? "

একটু হেসে রাশমিন বললো, "দৌড়ঝাঁপ কোথায় করলাম? আমি  তো হাটাহাটি করছি।"

 রিনিঝিনি হাসিতে রাশমিন দুলে দুলে উঠছে। আমি বললাম, "ওই একই কথা। "

" না দুই কথা।"

"  আচ্ছা, তাই। দুই কথা।কিন্তু হাটাহাটিই বা কেন?"

"হাঁটাহাঁটি না করলে ভর্তি হব কিভাবে?"

"কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কেন? তুমিতো যে কোন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হতে পারো।"

"  তা পারি। বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছি। এইবছর আমার ইন্টারমিডিয়েটে রেজাল্ট ভালো হয়নি, তাই ইমপ্রুভমেন্ট দিচ্ছি। সামনের বার মেডিকেলে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভালো করে  চেষ্টা করব। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ইংরেজিতে চান্স পায় তাহলে পড়বো, না হলে পড়ব না। আপনি ইংরেজিতে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন না? আপনি তো ছাত্র নেতা। "

"হ্যাঁ, অবশ্যই পারবো। তোমার তো ইংরেজিতে এমনিতে চান্স হয়ে যাবে। আমি ব্যবস্থা করে দেবো। "

"আমি জানি আপনি পারবেন। সেই জন্যই তো আপনার কাছে আসা। "

আমার স্বপ্নের সুনীল আকাশে কোথা থেকে জানিনা একটু একটু করে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। একদিন এই কালো মেঘ থেকে প্রচন্ড ঝড় উঠবে। আর সেই ঝড় আমার  জীবনটা পুরোপুরি তছনছ করে দিবে।তারপর নেমে আসবে অন্ধকার, ঘোর অন্ধকার। অন্ধকার আর অন্ধকার। 

মানুষ প্রেমে পড়লে প্রেমিকার মঙ্গল চায়, তার সাফল্য কামনা করে কিন্তু আমি করছি তার উল্টো। আমি চাচ্ছি, ওর রেজাল্ট যেন ভালো না হয়, তাহলে ও অন্য কোথাও যেতে পারবেনা। 

   


জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজিতে যেভাবেই হোক আমি তাকে ভর্তি করে দেবো। সে সারা জীবন আমার থাকবে। চোখের সামনে থাকলে মনেরও গভীরে ঢোকা যাবে। চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হয়ে যেতে পারি।কি হীন স্বার্থপর এর মত আমার চিন্তাভাবনাগুলো নিজেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমার কান্না পাচ্ছে। বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কেন আমি ভালবাসতে গেলাম। ভালোবাসা আমার জন্য না। আমার জন্য ভালো গলা বাজি, অস্ত্রবাজী।ভালোই তো ছিলাম। কেন বুকের ভিতর এই আগ্নেয়গিরির  অগ্নিপাতের  জন্ম জিতে গেলাম? 

" আপনি মনে হয় কিছু বলবেন? "
রাশমিন  হেসে বলল। সে প্রতিটি কথাতেই হাসে। হাসি তার কথার একটি অঙ্গ। এইরকম হাসি হাসি কথা জনম জনম ধরে শোনা যায়। 

" হ্যাঁ, একটি কথা বলি বলি করে বলতে পারছিনা। কথাটা অতি ছোট কিন্তু তা বলার জন্য বিস্তর অবসর আর ব্যাপক পরিসর দরকার, তুমি শুনবে? "

"হ্যাঁ, বলেন। একটা কেন হাজার কথা শুনবো। আপনার কথা শুনতে ভালই লাগে। এমন নেকা নেকা ভাবে কথা বলেন যেন, ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানেন না। "

"আসলেই জানি না। সত্যি ভাজা মাছ আমি কখনো উল্টে খাইনি। "
রসিকতা করে বললাম।

রাশমিন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"কেনো?"
আমি আবার হেসে বললাম, "কারণ, ভাজা মাছ আমি খাই না। "
রাশমিন চটপট জবাব দিল, "আমিও। "
"বাহ, তাহলে তো আমাদের ভিতর একটা মিল খুঁজে পাওয়া গেল। "
"আরো কিছুদিন যেতে দিন দেখবেন, আরো কত মিল পাওয়া যাচ্ছে। "
"রাশমিন একটা জায়গায় বেড়াতে যাবে? "
"কোথায়? বলেন। "
"তোমার সময় হবে কিনা বল? "
"কেন হবে না? বলেই দেখেন। "
"চলো বারোবাজার যাই। "
" সেখানে কী?"
"তুমি কখনো যাওনি? "
"না। "
বারোবাজার জায়গাটি রাশমিনদের বাড়ি থেকে বেশি দূরে না। জায়গাটি বিখ্যাত এবং পবিত্র। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, 
" বল কি, এত বিখ্যাত জায়গা, একটা পবিত্র জায়গা, ঐতিহাসিক জায়গা, তুমি যাওনি? সেখানে গাজী কালু  চম্পাবতীর মাজার আছে। এবং আরো অনেক কিছু আছে । শোনোনি মাটির নিচ থেকে বড় বড় মসজিদ বের হয়েছে?ওই পবিত্র জায়গাতেই তোমাকে পবিত্র কথাটি বলতে চাই। যাবে? "

রাশমিন ঘাড়ে  ঝাকি দিয়ে বললো, " হ্যাঁ যাবো। কবে?"
"আজ, এখন।  "
"এখনি?"
"হ্যাঁ। "
"চলেন। "
আমরা উঠে পড়লাম। রাশমিন আর আমি পাশাপাশি হাঁটছি। ওর শরীর থেকে ভেজা পদ্ম ফুলের ঘ্রাণ ভেসে ভেসে আসছে। সবকিছু কি সুন্দর লাগছে। চারিদিকে কি পরিচ্ছন্ন। আমরা পুকুরের পাড়ের উপর দিয়ে ঘাসের রাস্তা ধরে হাঁটছি। পুকুরে একটা হাঁস আনন্দ করে  সাঁতার কাটছে। কি দারুন লাগছে আজ সবকিছু। মনে মনে একটা ছক রেখে ফেললাম। বারবাজার যেয়ে কী কী করব। 

গাজীর পবিত্র মাজার সামনে রেখে রাশমিনের মুখোমুখি  দাঁড়িয়ে বলবো, " রাশমিন, আমি তোমাকে ভালোবাসি।"

তারপর যা হবার হবে। গান-বাজনার আয়োজন করব। মাজারে রান্না বান্না করে খাবার আয়োজন করব।  উৎসব চলবে। আর একদিকে আমরা দুইজন নির্জনে বসে মনের কথা আলোচনা করব।আজকের দিনটি হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মরণীয় দিন। 

কলেজ বাউন্ডারী ছাড়িয়ে, আসাদ হলের গেট পার হয়ে স্টেডিয়ামের কাছাকাছি চলে এসেছি। খালি রিক্সা পাচ্ছিনা। রিকশায় করে পাল পাড়ি যেয়ে বাসে উঠব ব্যাস। ঐ তো একটা খালি রিক্সা আসছে। ডাক দিলাম, "ঐ খালি? "

হঠাৎ মাটিফুড়ে কাল সাপের মত, রাশমিন আর আমার মাঝখানে, একেবারে আমার নাকের ডগায় একটি হ্যাংলা পাতলা ছেলের উদয় হলো।সে উচ্ছ্বাসে আবেগে  চিৎকার করে বলল, "আরে রাশমিন, এখানে? "

ছেলেটির উচ্ছ্বাসের চেয়ে আরো বেশি আনন্দিত হয়ে,  উচ্ছ্বসিত হয়ে, হ্যান্ডশেক করার উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে  আবেগে চিৎকার করে রাশমিন  বললো, "আরে হ্যাটট্রিক, যশোরে? কী সৌভাগ্য আমার। একটা কল পর্যন্ত করলে না?"




ও, তাহলে এই ছেলেটির নাম হ্যাটট্রিক। স্কিন জিন্স। হাফহাতা গেঞ্জি, পায়ে উঁচু স্যান্ডেল। রাশমিনের সাথে এর কিসের সম্পর্ক? রাশমিন আর হ্যাটট্রিক কথা বলেই যাচ্ছে ঝড়ের বেগে। আমি এখানে থার্ড পারসন। যেন আমি কেউ নই। এখানে নেই, কখনো ছিলামও না। একে অপরের হাত ধরে হ্যান্ডসেক করেই যাচ্ছে। ছড়াছাড়ির নাম পর্যন্ত নেই। আমি অগত্যা হাত বাড়িয়ে দিলাম, 
"পরিচিত হই, আমি তুষার। "
"আমি হ্যাটট্রিক, রাশমিনের বন্ধু, বুয়েটে পড়ি। "

রাসমিন আমার সম্পর্কে কিছুই বলল না, আমিও আর কথা বাড়ালাম না। তারপর রাশমিন আবার হ্যাটট্রিক নিয়ে মেতে উঠলো," যশোরে কেন? "

হ্যাটট্রিক, "যশোরে খড়কি  আমার নানি বাড়ি। তুমি যশোরে কেন? ও তোমার বাড়ি তো যশোর। "

রাশমিন,"  হ্যাঁ, পাশেই সাতমাইল। "

হ্যাটট্রিক, "চলো আমার নানি বাড়ি যাই। "

রাশমিন, "না, চলো আমাদের বাড়িতে। "

কথা বলতে বলতে রিকশা এসে গেল। রিক্সাওয়ালা আমার কাছে জানতে চাইলো, "কোথায় যাবেন? "

কষ্ট,রাগ, ক্ষোভ মনের গভীরে চেপে রেখে বললাম,   "কোথাও না। "

হ্যাটট্রিক লাফ দিয়ে রিকশায়  উঠে বসলো। তারপর রাশমিনকে টেনে তুললো।রাশমিনও হাসতে হাসতে হ্যাটট্রিকের পাশে বসলো। আমার সাথে একটিও কথা বলল না। যেন আমি কেউ না।রাশমিন আমাকে চেনে না। কোনোদিন দেখেওনি।তারা খড়কির দিকে চলে গেল। আমি কাঁটা কলা গাছের মতো ধপাস করে পাশের বেঞ্চের উপর বসে পড়লাম। কানে তখনও রাশমিন- হ্যাট্রিকের খুশি খুশি হাসির ধাক্কা এসে লাগছে। হ্যাটট্রিক তার একটি হাত রাশমিনের ঘাড়ের উপর দিয়ে রেখেছে। রিক্সা খড়কির দিকে চলে যাচ্ছে।




(২২)




মিন্টু বলল," তুষার ভাই,চা দেবো? চা খাবেন? "

" আরে ধুর, রাখো তোমার চা। তুমি তো মিয়া সব সময় চা বিক্রির ধান্দা নিয়ে আছো। "

রাগে,অপমানে, ক্ষোভে,হতাশায় সমস্ত শরীর জ্বলছে। এ তো তার কিছু জানে না।কিচ্ছু জানে না। সে ধিরে সুস্থে কিছুটা আপন, কিছুটা ব্যবসায়ী ভঙ্গিতে বললো,
"না বলছিলাম, মাথা ধরে বসে আছেন। মাথায় যন্ত্রণা করলে চা খেলে সেরে যায়। দেবো এক কাপ আদা চা?"

"সারে, চা খেলে সারে। কিন্তু তোমার ঐ ছেকারিন খেলে সারে না। বিড়ি দাও। "

মিন্টু একটা সিগারেট এগিয়ে দিল।বললাম, "ধুর মিয়া  এক প্যাকেট দাও। "

মিন্টু আমাদের কলেজের নাইট গার্ড।রাতে  কলেজ পাহারা দেয়। দিনের বেলা গেটের পাশে দোকান খুলে বসে।তার  প্রধান পসরা হলো চা। সে সারাদিন চা বেঁচে। বাড়ি থেকে চা বানিয়ে আনে।চা তো না লাল ছ্যাকারিনের পানি। হলের বেকার ছেলেপুলেরা সব মজা করে এক টাকা কাপ দরে খেয়ে বিড়ি ফুকতে ফুকতে মজা করে। মিন্টু সিগারেট দিয়ে বলল, "আপনার চোখ লাল কেন?  জ্বর টর নাকি? "

কথা বলতে বলতে সে আমার কপালে হাত রাখল। সে আমার আত্মীয় না। আমি তার কোনদিন কোন উপকারও করিনি, বরং মজা করে মাঝে মাঝে দু একটা সিগারেট চায়ের পয়সা মেরে দিই। 

"তুষার ভাই, আপনার গায়ে তো অনেক জ্বর।দুটো প্যারাসিটামল খেয়ে রুমে যেয়ে শুয়ে থাকেন। "

তার আন্তরিকতায় আমার বুকের ভেতর কান্না ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো। তাড়াতাড়ি উঠে রুমে চলে আসলাম। কেঁদে কেঁদে নিজেকে হালকা করতে চাইলাম। চোখের পানিতে বালিশ ভিজে গেল। 

মানুষ এত স্বার্থপর হয়?সে তার স্বার্থ উদ্ধারের জন্য  যে কোন ভূমিকায় অভিনয় করতে পারে? এই যে রাশমিন বারবার আমার কাছে আসে।এই যে আমার  হৃদয়ের হাহাকার-  কত কথার মাধ্যমে কতবার বোঝাবার চেষ্টা করেছি, আহত হয়েছি- সেসব একবারও সে অনুভব করতে পারেনি? তার কি মন বলে কিছু নেই? তাহলে সবই তার অভিনয়? তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে, বলতে হবে-  আমার দেখা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী সে। শ্রেষ্ঠ স্বার্থপর সে। তার অভিনয়ের ভেতর কোন  খাদ নেই। কি অকৃত্রিম তার অভিনয়, কি সুচারু তার কলা কৌশল। অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে সে অন্তরের মূল  ধরে টান মেরেছে। আমার আর রক্ষা নেই আমি এক বিশাল বৃক্ষের মতো রাশমিন নামক সিডরের তান্ডবে সমূলে উপড়ে পড়েছি। আমার আর বাঁচার কোন সম্ভাবনা নেই। এখন শুধু ধুকে ধুকে মৃত্যুর প্রহর গোনা  ছাড়া আর কিছু করার নেই। এই হৃদয়টা ছিঁড়ে তার হাতের মুঠোয় বন্দি করে দিয়েছি। এখন আর করার কি আছে। সে যদি এখন দয়া করে আমাকে ভালোবাসে তবেই আমি বাঁচতে পারি, নাহলে নয়। কিন্তু সেই সম্ভাবনা একেবারেই শূন্য। এক'টা দিন সে শুধু পাকা খেলোয়াড়ের মত আমাকে নিয়ে খেলেছে। আর এখন অন্য একজনের সাথে চলে গেছে। যে কান্না দিয়ে তার প্রতি আমার ভালোবাসা শুরু হয়েছিল সেই  কান্নার আর শেষ নেই। এখন কান্নাই আমার জীবন। বাকি জীবন কান্নাকেই সাথী করে বাঁচতে হবে। হাই আমার নিয়তি। 

সমাজের মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের ঘৃণা করে। আমি তাই কখনো রাশমিনের সামনে আমার রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ করতে চাইনি। কিন্তু এখন তো দেখছি, এইসব সামাজিক স্বার্থান্ধদের কাছে একজন রাজনীতিকের লুকানোর কিছুই নেই। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব একটা আদর্শকে ধারণ করে, একটা বিশাল জনসমষ্টি  ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করে,আদর্শের জন্য  সংগ্রাম করে,দেশের প্রয়োজনে জীবন বিলিয়ে দেয়।কিন্তু এরা?




কোথা থেকে মাইকে গান ভেসে আসছে-   কিছু কিছু মানুষের জীবনে ভালোবাসা চাওয়াটাই ভুল। সারাটি জীবন ধরে দিতে হয় শুধু সেই ভুলের মাশুল। 

আমার তিনতলা রুমের পেছনে লম্বা লম্বা সেগুন গাছের বাগান। সেগুন গাছগুলি তিনতলার জানালা ছাড়িয়ে ছাদের উপরে উঠে গেছে লম্বা চিকন। যদি এই বিল্ডিং এর আড়াল আশ্রয় না থাকতো তবে কোন কালে বাতাসে সেগুলো পড়ে মাটির সাথে মিশে যেত। মিশে যেত কি, এভাবে তারা বেড়েই উঠতে পারতো না। কিন্তু এ কথা ভাবাও অবান্তর,  কেননা-  এই গাছগুলো বড় হবে, এক সময় কাটা পড়ে যাবে, পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যাবে। কিন্তু এই বিল্ডিং থেকে যাবে। সুতরাং এখনো এই গাছগুলো যথেষ্ট নিরাপদ। কিন্তু আমার ভালোবাসা নিরাপদ না। যে ভালবাসা রাশমিনের  নীরব সম্মতির আশ্রয়ে তরতর করে ঐ সেগুনগাছগুলির মত বেড়ে উঠেছিল, হঠাৎ ভোজবাজির মত সেই আশ্রয় উধাও হয়ে গেছে। শুরু হয়েছে তুমুল বিরহে কষ্টের কালবৈশাখী। আমি মূল শুদ্ধ উপড়ে পড়েছি। 

সেগুন বাগানের ওপাশে স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে চলে গেছে একটা পিচ রাস্তা।  আইসক্রিমওয়ালা মাইক বাজিয়ে সেই রাস্তায় আইসক্রিম বিক্রি করছে।  তার মাইক থেকে ভেসে আসছে গান -

কিছু কিছু মানুষের জীবনে, ভালোবাসা চাওয়াটাই ভুল। সারাটি জীবন ধরে দিতে হয় শুধু সেই ভুলের মাশুল। 


গানের সুর হৃদয় ছুঁয়ে যায়, ছুয়ে যায় তার কথাগুলোও।মিলে যায় কারো কারো জীবনের সাথে। না জানি কোন কবির হৃদয় চেরা রক্তে লেখা ওই গানের কথাগুলি। না জানি কত কষ্ট মিশে আছে তার অন্তরে অন্তরে। আমার জীবন আর ওই গানের কথা গুলি আজ একে অপরের সাথী।

চোখের পানিতে বালিশ ভিজে চপচপে হয়ে গেছে।মাথায়  তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। জ্বরটা আবার বাড়লো নাকি? মাথা কিছুতেই তুলতে পারছি না। আবার বালিশেও রাখতে পারছি না। বাক্সের ভেতর থেকে বালিশের কাভার এর উপর দেওয়ার জন্য বালিশের চাদর বের করলাম। 

নানান নকশার ছোট্ট একটা চাদর।দুটো পাখি মুখোমুখি বসে আছে। এই চাদর মা আমাকে দিয়েছে।মা আমাকে বলেনি ওই চাদরটি কে দিয়েছে। কিন্তু আমি জানি কে মাকে আমার জন্য চাদরটি দিয়েছে।  

 চাদরটি বালিশের উপর বিছিয়ে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম। ড্রয়ারে নাপা ছিল খেয়ে নিলাম। আস্তে আস্তে মাথাটা হালকা হতে শুরু করলো। মনে পড়লো শিউলির কথা। 

সুন্দর চটপটে একটা মেয়ে। তার কাজ হলো,  আমি বাড়ি গেলে আমার পছন্দের তরকারি রান্না করে মাকে দিয়ে যাওয়া। সংসারের সমস্ত কাজে তার পারদর্শিতার অভাব নেই শুধু লেখাপড়া ছাড়া। পরপর দুই বছর এসএসসি ফেল করে, লেখাপড়া ছাড়ান দিয়ে বাড়ি বসে আছে। 

আমি একদিন তাকে ডেকে বললাম, "শিউলি, তুমি কি লেখাপড়া ছাড়ান দিয়েছো? "

শিউলি একটু মন খারাপ করে,মাথা নিচু করে  বলল,  "হ্যাঁ, ভাইজান। "

"কেন, বড় হয়ে গেছ তাই? "
"মানে? "
"না দেখো না, গরুর বাছুর বড় হয়ে গেলে দুধ ছাড়ান দেয়?"

সে কষ্টমিশ্রিত কন্ঠে  বলল, "আপনি আমাকে গরুর বাছুর বলছেন? "

"ছি ছি আমি কি তাই বলেছি? না তুমি বড় হয়ে গেছো না। তোমার বাপ তোমার বিয়ের জন্য চিন্তা শুরু করে দিয়েছে। "

সে রেগে বলল,"  তাতে, আপনার কি? মানুষের  এত অহংকার ভালো না। না হয় আপনি ভালো ছাত্র। "

শিউলি প্রায় কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।বড় লোকের  একমাত্র আদুরে  মেয়ে। সাত ভাই চম্পা টাইপ।পাঁচ ভাইয়ের এক বোন। অতি আদরের সে একেবারে গোল্লায় গেছে। তাছাড়া তার গোষ্ঠীর সেই বড় মেয়ে। আমার বাপের সাথে শিউলির বাপের এমনিতেই সম্পর্ক খুব ভালো। আমার বাপ আর শিউলির বাপ আপন মামাতো ফুফাতো ভাই। অনেকদিন তাদের মনে বিয়াই হওয়ার শখ। ব্যাপারটা ওপেন সিক্রেট এর মত। আর শিউলি ধরে নিয়েছে আমি ওকে বিয়ে করব। কিন্তু আমি মাকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছি যে, শিউলি  যত সুন্দরই হোক তার মত একটা অশিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না।তবু শিউলি আশায় আশায় আছে। আমার বাপ ও কিছুটা স্বার্থপরের মত লেগে আছে। শিউলির পাঁচ ভাই পাঁচ লাঠি । আরো গোষ্ঠির লোকজন তো আছে। আমিও জানি শিউলির সাথে আমার বিয়ে হলে গ্রামে আমাদের শক্তি সামর্থ্য বাড়বে। 
আব্বার প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়বে। তবু আমি কখনো তাকে মেনে নিতে পারিনি। আর পারবও না। কিন্তু শিউলি নাছোড়বান্দা। জানি তার এই চাওয়ার ভিতর কোন অন্যায় নেই। কিন্তু প্রশ্রয়ও তো নেই। সে আমাকে কিছুটা ভয় পাই। এই কারণে কোন কিছু আমাকে সরাসরি দেইনা দেই মায়ের মাধ্যমে। এই চাদরটিও সে রকম। ওটা আমি কখনো ব্যবহার করিনি। দীর্ঘদিন ধরে বাক্সের ভেতরে পড়েছিল। আজ কি করে জানি না  হঠাৎ তারই প্রয়োজন হলো।

 


(২৩)





আমার পাশের সিটে বসে আছে তৌফিক।আমাদের মাইক্রোবাসটি  ঢাকা -খুলনা রোড ধরে ছুটে চলেছে,  ঝিনাইদহের দিকে। উদ্দেশ্য ঝিনাইদহ জেলখানা।  সেখানে এক রাজনৈতিক বড় ভাইকে দেখতে যাচ্ছি। তৌফিক আমার কপালে হাত দিয়ে বলল,  "তোর তো আবার জ্বর এসেছে। অনেক জ্বর। তোর না আসায় ভালো ছিল। শরীরটা এভাবে শেষ করিস না। "

আমি রেগে যেয়ে বললাম,  "ভালো না লাগলে তুই নেমে যা। শরীর আমার, জীবন আমার, মন আমার -  আমি কি করবো সেটা আমি বুঝবো। আমি যা খুশি তাই করব। "

তৌফিক, "রেগে যাচ্ছিস কেন? মেজাজ দেখাচ্ছিস কেন? "

তুষার, "তো কি, তোর সাথে খোশ গল্প করতে হবে? "

তৌফিক,  "তোর মেজাজ আর বেশি দিন থাকছে না।"
 
তুষার, "কেন? "

তৌফিক,  "তোর বিয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে। "

বলেই পকেট থেকে একটা ছবি বের করে আমার চোখের সামনে মেলে ধরল। আমি দেখলাম ছবিটা শিউলির। একটা লাল পেড়ে শাড়ি,হাতা কাটা  হালকা রঙের ব্লাউজ। তাকে খুব চমৎকার লাগছে। কিরকম পটল চেরা দুটো চোখ মেলে সে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। 

তুষার,  "এ ছবি তুই কোথায় পেলি? "

তৌফিক,  "আমি পরশু তোদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তোদের গ্রামে আমার ফুফু বাড়ি না? সেখান থেকে ফেরার পথে তোদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তোর মা অনেক কথা বলল। কান্নাকাটি করলো। তোর শোকে সে মৃতপ্রায়। শেষে এই ছবিটা আমার হাতে দিয়ে বলল, দেখো বাবা, বলে কয়ে তুষারকে রাজি করাতে পারো কিনা? বিয়ে দিলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।"

তুষার,  "মা ছবি দিলো আর তুই নিয়ে এলি? "

তৌফিক,  "কেন কি হয়েছে? সেলাই করার চাদর মাথায় তো শুতে পারিস। "

ছবিটা তৌফিক এর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে চলন্ত  মাইক্রোবাসের জানালা দিয়ে টান মেরে ফেলে দিলাম। পরক্ষণেই চমকে উঠলাম। এটা কি করে হলো? ছবিটা ঘুরতে ঘুরতে যেয়ে পড়ল রাশমিনদের বাড়িতে যাওয়া পথের উপর।এই পথ ধরে কিছুদূর গেলেই রাশমিনদের বাড়ি। 

পকেট থেকে সিগারেট বের করলাম। 
তৌফিক বললো,  "কিরে, সামনের ছিটে বড় ভাই'রা আছে না? "

তুষার, " আরে,রাখ তোর বড় ভাই। "

কেউ কিছু বলল না।নিজের ইচ্ছে মত সিগারেট  টানতে লাগলাম। সামনের সিটে বসা এক বড় ভাই বলল, "তুষার, তুই ৩০ মিনিটে পাঁচটা সিগারেট খেয়েছিস  ধোয়াই থাকা কষ্ট ।যদি  বেশি নেশা লাগে, ডাইল খা।ডাইল খাবি? "

তুষার, "দেন।"

বড় ভাই হেসে যত্ন করে এক বোতল ফেনসিডিল এগিয়ে  দিল। দ্রুত মুটকি খুলে ঢক ঢক করে শেষ করলাম। আহ্  কি শান্তি। প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। 

তৌফিক টানা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে  বলল,  "সিগারেট, মদ, ফেনসিডিল  কিছুই বাদ দিচ্ছিস না। হিরোইন ধরবি কবে? "

আমি স্মিত হেসে  বললাম, "দেখি যত তাড়াতাড়ি ধরা যায়। "

তৌফিক,  "একটা মেয়ের জন্য তোর এত কিছু? যার জন্য তুই তোর জীবন ধ্বংস করছিস, যার জন্য তুই এত কষ্ট করছিস, নিজেকে শেষ করছিস সে কিন্তু তোকে নিয়ে একটুও ভাবছে না। অথচ তুই তার জন্য কষ্ট পাচ্ছিস। নিজেকে তিলে তিলে শেষ করছিস। "

তুষার, " তার কাজ সে করছে, আমার কাজ আমি করছি। "

তৌফিক, "ও তোর কাজ নেশা করা? খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ।  কিন্তু , একটা কথা তোকে বুঝতে হবে, রাশমিন তো তোকে ভালবাসে না। "

তুষার, "না বাসুক।"
তৌফিক, "তাহলে যে কাজটা তুই রাশমিনের জন্য করছিস, সেই কাজটা একটাও ধাড়ী ছাগলের জন্যও করতে পারিস। "
তুষার, " মানে, তোকে কিন্তু ধাক্কা মেরে মাইক্রো থেকে ফেলে দেবো। "

তৌফিক,   'রাগছিস কেন? শোন, তুই যার জন্য জীবনপাত করছিস, সে কিন্তু এ ব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। সে নির্বিকার,  ঠিক জড় পদার্থের মত, অবলা প্রাণীর মতো। একটা ছাগলকেও  যদি ভালবেসে দুদিন ঘাস পানি খাওয়াতিস একটা ফল পেতিস । কিন্তু তুই এমন একজন মানুষকে ভালোবেসেছিস যার কাছে এর কানাকড়িও মূল্য নেই। হায় তোর ভালবাসা, হায় তোর কপাল। "

তুষার, "শোন, ফালতু প্যাচাল করিস না। যদি আমার মত প্রেমে পড়তিস, তবে বুঝতিস - কিভাবে একজন চন্ডীদাস  ১২ বছর বড়শি  ফেলে বসে থাকতে পারে। কত ধৈর্য থাকলে একজন মানুষের মন না জেনেও১২ বছর তার জন্য প্রতিক্ষা করা যায়। 
 মনে কোন সন্দেহ থাকলে, দোলাচল থাকলে, এত দীর্ঘ সময় প্রতীক্ষা করা সম্ভব না। আমি বিশ্বাস করি,রাশমিন একদিন না একদিন আমার হবেই। আমার ভালোবাসা যদি সত্যি হয়ে থাকে তো একদিন না একদিন আমি তাকে পাবোই। "

তৌফিক,  "হ্যাঁ, পাবি তবে তোর জীবদ্দশায় না।  মৃত্যুর পর। তার আগে না। "

তুষার,   "এই পৃথিবী শেষ পৃথিবী নয় রে পাগলা। এই জীবন শেষ জীবন নয়। মৃত্যুর পরেও পৃথিবী আছে,  জীবন আছে। রাশমিনকে আমি যদি এই পৃথিবীতে, এই জীবনে না পাই তবে তার  জন্য পরবর্তী পৃথিবীতে, পরবর্তী জীবনে অপেক্ষা করব। "

সুখ সুখ আমেজে, মাইক্রোবাসের ঝাঁকুনিতে নেশার  শান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি। 

জেগে উঠে দেখি মাইক্রোই লোক অর্ধেক। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, "ওরা কোথায় গেছে?"

ড্রাইভার,  "এমপি সাহেবের  কাছে । "

অবশ্য আমি আগেই অনুমান করেছিলাম এরকম একটা কিছু হবে।ইদানিং আমি লক্ষ্য করছি, সবকিছুতেই কেমন জানি একটা চেষ্টা পার্টি করতেছে।নেতারা আমাকে এড়িয়ে চলতে চাই।  আগে কোন প্রোগ্রাম হলে, বড় নেতা বা এমপির বাসায় গেলে বড় ভাইয়েরা আমাকে সাথে নিতে চাইতো বেশি বেশি। এখন ইদানিং নেশা করার পর থেকে দেখছি, তারা বেশি বেশি আমাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। এতে আমার প্রতিদ্বন্দ্বীদেরই লাভ হচ্ছে। আগামীতে তারা দলে ভালো জায়গা পাবে আমি  ছিটকে পড়বো কমিটি থেকে। কত ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে  যশোর জেলা কমিটিতে একটা পথ পেয়েছি সেটা হারাতে হবে। আজ যে চারজন এমপি সাহেবের বাসায় গেল সেখানে আমার কথা বলবে। বলবে - আমি নেশা করি, নেশা করে মাইক্রোর ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছি। এমপি সাহেবের চোখে আমি খারাপ হয়ে যাব। ফায়দা লুটবে আমার প্রতিপক্ষ। অবশ্য ইদানিং আব্বার কলেজের কারণে এমপির সাথে আমার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। আব্বা কলেজ থেকে এমপিকে নিয়োগ বাণিজ্য করতে দেইনি। এমপির রাগ আছে আব্বার উপরে এবং আমার উপরে। 

দ্রুতগতির একটা হোন্ডা এসে আমার সামনে খ্যাঁচ করে ব্রেক কষে থামলো।হোন্ডায় ২  জন আরোহী। চালকের মাথায় হেলমেট। গাড়ি দাড় করিয়ে চালক মাথা থেকে হেলমেট খুললে দেখলাম -

ছাত্রনেতা আপন। আমরা জেলখানায় যে ছাত্রনেতা পাবলাকে দেখতে এসেছি এ তার চাচাতো ভাই। অর্থাৎ আমাদের সবার উদ্দেশ্যই এক, পাবলা ভাইয়ের সাথে দেখা করা। 

বিকেলের সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। আর দেরি করা ঠিক না। আমরা টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম। এখন আমরা মোট ছয় জন। ছয়টা টিকিট কাটলাম। 





(২৪)




জেলখানায় কয়েদিদের সাথে দেখা করতে হলে,প্রথমে  একটা সরু গলির ভেতর দিয়ে ঢুকতে হয়। এই লম্বা গলির কয়েকটা ছোট ছোট উপগলি আছে। একটা উপগলিতে আমরা অবস্থান নিলাম। আমাদের সামনে মোটা মোটা লোহার রড। তার ওপর লোহার নেট। এই রড এবং নেট থেকে এক হাত পর আরো মোটা মোটা লোহার রড এবং নেট। তারপর জেলের কয়েদিদের দাঁড়ানোর স্থান। কয়েদি এবং দর্শনার্থীদের মাঝে দুই হাতের ব্যবধান, কিন্তু তা লোহার রড এবং নেট দ্বারা সুরক্ষিত । 

আরে ও  কে আসছে? পাবলা ভাই না?হ্যাঁ, পাবলা ভাই। কিন্তু তার এ কি দশা। মুখ ভর্তি দাড়ি, গোঁফ, মাথায় টুপি? একি অবস্থা তার? জেলের ভিতর এই ভন্ডামির কি মানে? এতো ঘন্টায় দশটা গোল্ডলিফ সিগারেট খায়। নামাজ পড়া তো দূরের কথা,  এ  কোনোদিন ভুল করে পিছলেও পশ্চিম দিকে পড়েনি। নামাজ কালামের ধারে কাছেও যায় না। সে কিনা প্রায় এক হাত লম্বা দাড়ি রেখেছে?হলে দুজন তাস খেলে ঘন্টার পর ঘন্টা একসাথে সময় কাটিয়েছি।সে আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বন্ধু। পাশাপাশি গ্রামে আমাদের বাড়ি। 

আমার হঠাৎ বাম পাশের চোখের পাতা নাচতে শুরু করল। বাম পাশের চোখের পাতা নাচা মানে, যে কোন একটা ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা।  না জানি আজকে কী দুর্ঘটনা ঘটে?একেতো এখানে  পুলিশের ছড়াছড়ি। পুলিশের সাথে চিরদিনই আমার দা কুমড়া সম্পর্ক। এজন্য পুলিশ যেখানে থাকে তার ধারে কাছেও আমি যাই না।পাবলা ভাই লোকের মাধ্যমে সংবাদ দিয়েছিল বলেই দেখা করতে এসেছি।তাছাড়া তার সাথে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। জেলে আসার পর তার সাথে একদিনও দেখা করিনি। একটাই কারণ জেলখানা বা তার আশেপাশে পুলিশ গিজগিজ করে, ওদের দেখলে ঘৃণার বোধ জন্মায়। তাই পাবলা ভাইয়ের সাথে একবারও দেখা করতে আসিনি। এখন সে সংবাদ দিয়েছে কি জন্য দেখি। 


দীর্ঘ বিরহের পর পাবলা ভাই যেন আমার বুকে ঝাপিয়ে পড়তে চাইলো, আমারও সেই অবস্থা। কিন্তু লোহার শিকগুলোর জন্য তা সম্ভব হলো না। শুধু চোখে চোখে মিলন হল। কুশলাদি বিনিময়ের পর পাবলা ভাই সবাইকে সরে যেতে বলল। সবাই চলে গেল। তারপর সে বলতে শুরু করলো, 

"শোন তুষার। ছোটবেলা থেকে আমরা একই স্কুলে লেখাপড়া করেছি। সারা জীবন তোকে নম্রভদ্র  ভালো স্টুডেন্ট হিসেবে চিনি। দেখ রাজনীতি করতে যেয়ে আমরা লেখাপড়া শেষ হয়ে গেছে। অনার্সটা পাস করতে পারিনি। অথচ তুই তুখোড়ভাবে রাজনীতি করেও দিব্যি ভালোভাবে পাস করে গেলি। তোর একটা ভবিষ্যৎ আছে। তাছাড়া তুই তো বাপ মায়ের একমাত্র সন্তান। তোর বাপ মা তোকে নিয়ে কত আশা ভরসা করে আছে। তুই ছাড়া তাদের কোন ভরসা নেই। তুই তোর বাপ মায়ের কথা একবারও ভাববি না? তোর একটা কিছু হয়ে গেলে এই বয়সে তারা কোন ভরসায় বাঁচবে? বাপ মার প্রতি তোর কি কোন দায়িত্ব-কর্তব্য নেই? "

তুষার, "এসব কথা আপনি কেন বলছেন? "

পাবলা,  "সেদিন তোর বাপ এসেছিল। একবার দেখেছিস তোর চিন্তায় তার চেহারার কি হাল হয়েছে? তোর মা তো এখন মৃত্যু শয্যায় তোর চিন্তায়। তুই কি বাপ মায়ের কথা চিন্তা করে নেশা ছাড়তে পারিস না?  "

তুষার,  "আমি ছোটবেলা থেকে দুটো একটা বিড়ি সিগারেট খেতাম। কিন্তু পুরোপুরি খাওয়া শিখেছি আপনার কাছ থেকে। মনে আছে আপনার, একদিন আপনি আর আমি  রাত দুটোর সময় দড়াটানায় গিয়েছিলাম সিগারেট কেনার জন্য? আর পুলিশ সন্দেহবশত থানায় ধরে নিয়ে গিয়েছিল।সারারাত দুজন আটকা।পরে দলীয় সুপারিশে ছাড়া পেয়েছিলাম। মনে আছে আপনার? "

পাবলা,  "মনে আছে, সব মনে আছে। সে সব তো অতীত। যে আমি একটার পর একটা-।  যে আমি একটার আগুন দিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরাতাম, সেই আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। "

তুষার,   "কি বলেন? "

পাবলা,  "হ্যা,এখন আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। "

তুষার,  "শুনেছি, জেলের ভেতর গাজা, বিড়ি, সিগারেট - সব পাওয়া যায়। আপনি সিগারেট ছাড়লেন কেন? "

পাবলা,   "সে তুই বুঝবি না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ধর। দেখবি সব নেশা ছুটে গেছে। এভাবে আর নিজেকে শেষ করিস না। একটা মেয়ের জন্য তুই এভাবে নিজেকে শেষ করবি, আমি ভাবতেও পারিনা।আমি ভেবেছিলাম  জেল থেকে মুক্তি পেলে তোকে নিয়ে একটা আন্দোলন করবো। চিত্রা পুনঃখনন  আন্দোলন। তা তুই যেভাবে নিজেকে শেষ করছিস, তাতে মনে হয় না তা আর সম্ভব হবে। "

তুষার,  "হ্যাঁ, চিত্রা নদী পুনরায় খনন করা দরকার। তা না হলে আমাদের এলাকায় এক সময় মরুভূমিতে  পরিণত হবে। "

পাবলা, "ও শোন, তোর সাথে আর একটা কথা। "


পাবলা ভাই তার কথা শেষ করতে পারল না। হঠাৎ ঝড়ের বেগে একজন লাল গেঞ্জি পরা মাঝ বয়সি  লোক এল। তার  পুলিশের মত ছোট করে চুল কাটা।এসেই পাবলা ভাইকে ভিতরের দিকে  টানতে লাগলো।  

পাবলা ভাই মরিয়া হয়ে বলল," কি ব্যাপার এভাবে টানছেন কেন? আমরা পাঁচ মিনিটও তো কথা বলতে পারিনি। "

লোকটি শক্তভাবে বলল, "আপনার সময় শেষ। "

আমরা বাইরে থেকে চিৎকার করে বললাম, "না, হতেই পারেনা। "

শুরু হয়ে গেল তর্কাতর্কি।ছোট্ট গলিটার ভিতরে কথার বোম ফুটতে লাগলো। গম গম গম গম আওয়াজ। ছুটে এল তার সঙ্গীরা। পাবলা ভাই নিজেকে বারবার  ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো।সে পাবলা ভাইকে জেলের ভিতর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, আর আমাদেরকে সমনে গালিগালাজ করছে যাচ্ছে। আমিও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যা মনে আসছে তাই বলছি।  চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘর ফেটে পড়ার অবস্থা। হঠাৎ আমার পিঠে কিসের যেনো আঘাত পড়লো।তাকিয়ে দেখি এক হারামজাদা। লুঙ্গি পরা, গায়ে হাফহাতা গেঞ্জি। হাতে লাঠি। সেই লাঠি দিয়ে আমার পিঠে আঘাত করেছে। লোকটা কি একটানে মেঝের উপর পেড়ে ফেললাম। তারপর লাথি, চড়, কিল।ওর সাথে আরো দুজন ছিল। মারা মারিতে তারাও যোগ দিলো। তাদেরও সাইজ করলাম। এতক্ষণে আরো দুজন এসে গেছে। আমরা সবাই মিলে তাদেরও পেড়ে ফেলেছি। আর তারপর বুঝলাম যাদের সাথে মারামারি করছি এরা সবাই পুলিশ। কিন্তু ততক্ষনে দড়াম দড়াম মারামারি চলছে।আমি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পাশের গলিতে চলে এলাম।এই গলিতে কয়েকজন কয়েদি দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাদের সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। আতঙ্কে বুক ফেটে যাচ্ছে। যেদিকেই তাকাচ্ছি সেদিকেই পুলিশ। এখানে পুলিশের অভাব নেই। তাদের আস্তানায় ঢুকে তাদেরকেই মারছি।এরা মারতে মারতে আজ আমাদেরকে মেরেই ফেলবে। হঠাৎ পিঠে দড়াম করে ঘুষি পড়লো।তাকিয়ে দেখি,দুইজন রাইফেলধারী, পোশাক পরা পুলিশ। এতক্ষণ আমরা যাদের সাথে মারামারি করেছি সেই সব পুলিশদের কাছে অস্ত্র ছিল না। এদের কাছে অস্ত্র আছে। দুইজন দুই পাশ থেকে আমাকে মারতে শুরু করল। আমি প্রমাদ গুনলাম। আজ আর রক্ষা নেই। মৃত্যু অবধারিত। পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলার অসংখ্য রেকর্ড আছে পুলিশের। হঠাৎ আমার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। বললাম,    "ভাই, আমিতো মারামারির লোকনা। আমি আমার ভাইকে দেখতে এসেছি। তার জন্যই দাঁড়িয়ে আছি। "

কথা শুনে সাথে সাথে দুজন আমাকে ধাক্কা মেরে গলি থেকে বের করে দিল। 

"যা , বাইরে যা।"

বাইরে বেরিয়ে দেখি জেলখানার সামনে হাজার হাজার মানুষ। পুলিশ রাইফেল নিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে সতর্ক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি বেরিয়েই জনতার ভিড়ে মিশে গেলাম। ভিতরে এখন আরো পুলিশ ঢুকেছে। মারামারির গুড়ুম গুড়ুম শব্দ আসছে।হাউ মাউ কান্নাকাটি শোনা যাচ্ছে। আমার সংগীরা নিশ্চয়ই মার খাচ্ছে। এখন তো ওরা সংখ্যায় কম। আল্লাহই জানে, আজ ওরা সবাই মারা পড়বে কিনা।ভিড়ের ভিতর ভয়েভয়ে  হারিয়ে যেতে যেতে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,   "ভাই, এখানে এত লোক কেন? "

"শুনলাম, যশোর থেকে সন্ত্রাসী এসে, জেল ভেঙে আসামি নিয়ে যাচ্ছে। "

তার কথা শুনে আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া। এক মুহূর্তে আমরা সন্ত্রাসী হয়ে গেলাম? 

বুঝলাম এটা পুলিশের উর্বর মস্তিষ্কের রটনা।এখনই আমার এই স্থান ত্যাগ করা উচিত। কিন্তু পারলাম না। সবাইকে এইভাবে ফেলে রেখে আমি পালিয়ে যেতে পারি না। 

কিছুক্ষণ পর আমার সঙ্গীদের বের করে আনা হলো।জেল গেটের মূল ফটকের ভিতর তাদের ঢোকানো হলো। 

ভুঁড়িওয়ালা জেলার চেয়ারে বসে আছে। তিনি পেটানোর হুকুম দিলেন। শুরু হল ধুমছে মার। আমি ভিড়ের ভিতর দাঁড়িয়ে দেখছি আর ভয়ে কাঁপছি। থানা থেকে এক গাড়ি  পুলিশ এল। আমার সঙ্গীদের সেই গাড়িতে তুলে দেয়া হল। 

পরেরদিন পেপারে এলে -

জেল ভেঙে আসামি ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা। 






(২৫)



আজ দশ দিন হাসপাতালে পড়ে আছি। এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো হাসপাতলে ভর্তি হলাম। ছোটবেলায় একবার মেনিনজাইটিস হয়েছিল। তখন সাত দিন ছিলাম। এইবার দশ দিন ধরে পড়ে আছি। জ্বর এবং জন্ডিস একসাথে হয়েছে। নড়তে চড়তে পারছি না। মা আমার সেবা করে করে সেও শয্যাগত হয়েছে। এখন আব্বা লেগেছে। আর আমি সুযোগ পেলেই সিগারেট টানছি। এক পুরনো চ্যালাকে দিয়ে ফেনসিডিল এনে খাচ্ছি।


বাইরে হালকা হালকা বৃষ্টি পড়ছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আব্বা বিড়ি সিগারেট খায় না।

ইদানিং দেখছি সিগারেট খাওয়া ধরেছে। কিছুদিন যাবত কলেজ নিয়ে খুব সমস্যা যাচ্ছে তো । আব্বা  কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। এমপি টাকা খেয়ে অযোগ্য লোককে কলেজে ঢোকাতে চাই। আব্বা তা হতে দেবে না। এই নিয়ে ঝামেলা। 


আব্বা মনে হয় সিগারেট খেতে বাইরে গেছে। হাসপাতালের ভিতর আব্বা সিগারেট টানে না। সে হয়তো হাসপাতালে সামনে কোন চায়ের স্টলে বসে সুখ করে সিগারেট টানছে। এই সুযোগে আমিও একটা ধরাই। এখন আব্বা আসবে না। তার কাছে কোন ছাতা নেই। আব্বা না আসলেও, হাসপাতালে সিগারেট খাওয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু আমি এই হাসপাতালের আইন মানি না। আমাকে কোন ডাক্তার বা নার্স ঘাটাতে আসে না। কারণ, তারা দেখেছে ইতিমধ্যে শহরের বড় বড় নেতারা আমার সাথে দেখা করতে আসে। তারা আমার সাথে দীর্ঘ সময় হাসিমুখে গল্প করে। ডাক্তার এবং নার্সরা গদগদ হয়ে তাদের  সালাম দেয়। নেতারা ডাক্তারদের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। ডাক্তাররা আমার কাছে এসে, ধীরে সুস্থ সব কিছু শোনে। চিকিৎসার ব্যাপারে তাদের কোন গাফিলতি নেই। 


সিগারেট খাওয়া আমার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই অবস্থায় সিগারেট খাওয়া নাকি খুবই বিপদজনক। কিন্তু আমি না খেয়ে থাকতে পারিনা। সিগারেট টানার পর বেশ ক্লান্ত ক্লান্ত আরাম আরাম লাগে। চোখে ঘুম চলে আসে। শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ি। এইভাবে ১০ দিন চলছে। শরীরের কোন উন্নতি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। 



একটা গোল্ডলিফ সিগারেট ধরিয়ে দুটো টান দিয়েছি। পেছনে মাথার কাছে পা ভাঙা রোগী-  তার কাছে, কে যেন জানতে চাইলো,   "১০ নাম্বার বেড কোনটা? "


আমি তো ১০ নম্বর বেডের রোগী। আমাকে আবার এই অসময়ে কে খোঁজ করছে? মুহূর্তে চিন্তার তার ছিন্ন করে মুখ থেকে জ্বলন্ত সিগারেট ছিনতাই হয়ে গেল। নাকে ভেসে এলো রজনীগন্ধার বুক ভরা ফুরফুরে সুবাস। দীর্ঘশ্বাস টেনে বুক ভোরে বাতাস নিলাম। পরক্ষণে বাম পাশে তাকিয়ে দেখি রাশমিন। আমি বিস্ময় হা হয়ে গেলাম। তার মুখে সেই চির পরিচিত হাসি। চোখে হাজার কথার ছুটোছুটি। মাশকারা লাগানোর ফলে চোখ দুটি এত মোহনীয় হয়েছে যে সে বলার না।চোখের পাতায় লাগিয়েছে গোলাপি রঙ। কাজ করার সুতির শাড়ি,  বেগুনি রঙের। গোলাপি রঙের ব্লাউজ। চুলগুলো ছাড়া। আজ আমি খেয়াল করলাম, রাসমিনের চুল প্রায় মাটি ছুঁই ছুঁই। চুলগুলো যেমন লম্বা তেমন ঘন, কালো আরো বেশি। রাসমিনের শরীর থেকে মিষ্টি  একটা পারফিউমের বাতাস ভেসে আসছে। আমি যেন মুহূর্তের ভেতর সুস্থ হয়ে গেলাম।


"  রাশমিন,কখন এসেছ? "

" হ্যাঁ, আমি। কেমন আছেন? "



রাশমিনের এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট অন্য হাতে রজনীগন্ধা স্টিক। সিগারেটে দুটো টান মেরে সে খক খক করে কাশতে শুরু করল। এবার সে কঠিন হয়ে প্রশ্ন করল,"কই, বললেন না কেমন আছেন? "


"আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর রহমতে খুব ভালো আছি।" 

"ভালো? তা এখানে এই হাসপাতালের  রোগীদের বেড দখল করে আছেন কেন? "


যেন আমার উপর তার কত অধিকার,  সেই অধিকারের বলে সে কৈফিয়ত চাইছে। আমি তার কথাবার্তার কোন কুল কিনারা করতে পারছি না।সে এতদিন পর হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলো? এই ফুলেল শুভেচ্ছা কার জন্য? কেনই বা তার এই মোহনীয় সাজ? সে কি এই ফুল দিয়ে আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে? আমাকে, নাকি আমার এই দুরারোগ্য ব্যাধিকে?কাকে সে স্বাগত জানাতে চায়? 


একরাশ প্রশ্ন আর বেদনার জমাট  স্তুপ বুকের  ভিতরে ফুল উঠছে। 


" রাশমিন দাঁড়িয়ে কেন? বসো। "


ফুলগুলো তার হাতেই ধরা আছে। সিগারেটটা ফেলে দিয়েছে। সিগারেট টেনে টেনে তার চোখ এখন লাল। 


রাশমিন আমার মুখোমুখি বসলো। তার দুটো পরিষ্কার ফোলাফোলা গাল যেন রসালো জামরুলের মত, টসটসে হয়ে, আস্বাদিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। ডান হাতের নখ খোঁটা বন্ধ করে মাথাটা  বামদিকে ঝাঁকিয়ে চুল ঠিক করল।তারপর ধীরে সুস্থ বলল - আপনার, আপনার মোবাইল ফোন বন্ধ কেন? ঢুকাতেই পারি না।  


" তুমি তো ঢোকাতে পারবে না।"

"কেন?"

"ঢোকানো তো আমার কাজ।"

"মানে?"

"মানে কিচ্ছু না।তোমার সাথে মোবাইলে আমার যতবার কথা হয়েছে আমিই ঢুকিয়েছি।তুমি কখনো আমাকে কল দাও নি। আফটার অল তুমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে। আর সুন্দরী মেয়েরা কখনো ছেলেদের ঢুকায়া না।এটাই নিয়ম। "



রাশমিন ঘোর লাগা চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার নখ খুটতে শুরু করেছে। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। সে কি লজ্জা পেয়েছে? 


রাশমিন,   "আমি আজ ১৫-২০ দিন ধরে আপনার মোবাইলে ট্রাই করছি। কিন্তু একটাই উত্তর পাচ্ছি, এই মুহূর্তে মোবাইলে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।"


আমি বললাম,  "কম্পিউটারের ওই মেয়েটি সবসময় দুঃখিতই থাকে। কখনো শুনেছো, আপনার কলটি পেয়ে খুব আনন্দিত হয়েছি। না,  কখনো বলে না। কম্পিউটারের ওই মেয়েটির কাজই হল দুঃখ পাওয়া। সে দুঃখ পাওয়ার চাকরি করে। তাই সে সব সময়  তোমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে। "



রাশমিন একটু ম্লান হেসে বলল, শুনলাম আপনি ভয়ংকর রকম অসুস্থ। এখন দেখছি আপনি ভয়ঙ্কর রকম সুস্থ। না হলে এত রসিকতা করছেন কিভাবে? 


"ঠিক আছে , আর রসিকতা করবো না। এখন থেকে শুধু ভেউ ভেউ করে কাঁদবো।  তাহলে তো প্রমাণিত হবে আমি ভয়ংকর রকম  অসুস্থ?"


"না, আপনাকে কোন প্রমাণ করা করি করতে হবে না। শুধু বলেন, মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখেছেন কেন? "


"মোবাইল  বন্ধ করিনি। সে হারিয়ে গেছে। "


" জেলখানার ভিতরে ঢুকে পুলিশের সাথে মারামারি করলে তো মোবাইল হারাবেই। ভাগ্য ভালো তাই জীবনটা নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছেন। "


মোবাইল আমার হারিয়েছে সত্য, কিন্তু জেলখানার মারামারিতে না। ১৫ দিন আগের কথা, নেশা করে রাতের বেলা পৌর পার্কের ব্রিজের উপর শুয়ে ছিলাম। সকাল হলে দেখি মোবাইল নেই, হাতের আংটি নেই, গায়ে গেঞ্জিও নেই।  হারামজাদারা প্যান্ট ও খোলার চেষ্টা করেছিল। দেখি বেল্ট খোলা। আর দামি সুজোড়া তো নিয়েই গেছে। কিন্তু এ কাহিনী তো আর সবার সাথে বলে বেড়ানো যায় না। 


বললাম,  "আরে, না না। মোবাইল চুরি হয়ে গেছে।"


হঠাৎ রাশমিনের মোবাইল বেজে উঠলো। সে মোবাইল রিসিভ করল। 


"হ্যালো, স্লামালেকুম। কে বলছেন প্লিজ। কি ব্যাপার কথা বলছেন না কেন? "


আমি বললাম, "দেখো কোন বোবা টোবা হয়তো। "


রাশমিন,   "মোবাইলে তো আপনার কথাই শোনা যাচ্ছে। "


" কথা বললে তো শোনা যাবেই। "

"আপনি যা বলছেন তাই তো শুনতে পাচ্ছি। "


"শুনতে তো পাবেই। তুমি তো আর কালা না। "



রাশমিন  হোহো করে হেসে উঠলো। বলল, " ও এই কেস? দাঁড়ান, দেখাচ্ছি মজা। "


আমার মাথার কাছে মোবাইল মেজে উঠলো। ধরে দেখি রাশমিনের কল। তারমানে সে আমার চালাকি ধরে ফেলেছে। কথা বলতে বলতে আমিই তার সেটে রিং দিয়েছিলাম। সেভ করা নাম্বার। সহজেই রিং ঢুকে গেল। এখন রাশমিন আমার চালাকি ধরে ফেলেছে। ধরে ফেলে বিজয়ের হাসি হাসছে। কি সুন্দর লাগছে তাকে। চুলের অরণ্যে হারিয়ে যেতে যেতে মুখ নয় যেন পূর্ণিমার চাঁদ মেঘের আড়ালে আড়ালে উঁকি  দিচ্ছে।




তার রুপের আলোর নেশায় পাগল হয়ে যাচ্ছি।কিন্তু আমি জানি তাকে কখনো ছুঁতে পারবো না। ছোঁয়ার চেষ্টা করলে শুধু শুধু কষ্ট বাড়বে।আজ হয়তো সে হাসপাতালে কোনো রোগী দেখতে এসে,আমার খোঁজ পেয়ে,  আমার কাছে এসেছে। অথবা আমাকে করুণা করতে এসেছে। আমি তার জন্য নেশা করে করে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছি। হয়তো সে কারোর কাছ থেকে এই কথা শুনেছে। তাই সে এসেছে। মিথ্যা সান্তনা দিতে। মিথ্যা আশ্বাস দিতে।
অথবা মৃত্যু পথযাত্রীর কাছে শেষ ক্ষমা চাইতে এসেছে। সেদিন তৌফিক ক্ষমা চেয়ে গেছে। যেই আসছে দেখতে, সেই বুঝতে পারছে আমার সময় শেষ। সবাই শেষ ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে। এও হয়তো তাই।
 অথবা  সত্যি সত্যি আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে এসেছে । নিঃসন্দেহে মহৎ উদ্যোগ। কিন্তু তার সেই মহত্বকে কতটা মূল্যায়ন করতে পারব জানিনা। আমি কিচ্ছু জানি না। 

"রাশমিন, তোমার সাথে গল্প করেই যাচ্ছি। আপেল খেতে খেতে গল্প করো। "

" না, কিছু খাব না। আসার সময় অনেক কিছু খেয়ে এসেছি। "

"কেন মিছে অজুহাত সৃষ্টি করছো?আজ তো আর বোরখা পরা নেই। মুখ খোলাই আছে। "

মাথার কাছে টুল। টুলের উপর রাখা প্যাকেট। কথা বলতে বলতে প্যাকেট থেকে আপেল বের করলাম। এই কয়দিনে প্রচুর আপেল, কমলা লেবু, আঙ্গুর জমেছে। যেই আমাকে দেখতে আসে, কিছু না কিছু ফল নিয়ে আসে। নিজে অতো খেতে পারি না। সুযোগ পেলেই লোক দিয়ে খাওয়ায়। 

"পানির বোতল টা কই? এখানেই তো ছিল। "

" পানির বোতল কী হবে? "
" আপেলটা ধুয়ে দিতাম। "
"মনে হচ্ছে আমি রোগী। আপনি আমাকে সেবা করতে লেগে গেছেন। দেন আমার কাছে, আমি ধুয়ে নিচ্ছি। "

হাত থেকে আপেল নিতে যেয়ে তার হাত আমার হাতের সাথে লেগে গেল। আমার অন্তরে ঝড় বয়ে গেল। বামন হয়ে যেন লাফ দিয়ে চাঁদ ধরে ফেলেছি।আমার ভেতরটা উত্তেজনায় বারবার কেপেকেপে উঠলো।  এক জীবনের সাধনার বিনিময়ে কি ঐ হাত ধরা সম্ভব? কি এক উচ্চ আশা বুকে পুষে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করছি। 

আপেল খেতে খেতে রাশমিন বলল   "যারা আপনাকে দেখতে আসে,এটা ওটা নিয়ে আসে, তাই না? অথচ আমি  দেখেন,  বোকার মত খালি হাতে এসেছি। "


"তাতে কি হয়েছে? তুমি আমাকে দেখতে এসেছ, একি আমার কাছে কম? আমার জীবন ধন্য হয়ে গেছে। দেখো আমি ভালো হয়ে গিয়েছি। দেখ কালই আমি রিলিজ হয়ে বাড়ি চলে যাব। আমার আর কোন অসুখ নেই। "

তাকিয়ে দেখি মুখ নিচু করে রাশমিন কাঁদছে। 
চোখ মুছে, নাক টেনে সে বলল, 

"আপনাকে আমি যে আঘাত দিয়েছি, তার জন্য এই উপহাস আমার পাওনা ছিল। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।"

আমি অসহায়ের মতো বললাম,   "অনেক চেষ্টা করে তোমাকে ইংরেজিতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলাম। তবু তুমি চলে গেলে। "

"কী করবো বলেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে চান্স হয়ে গেলো। "
"একটা যোগাযোগ তো রাখতে পারতে। "
"আপনিও তো রাখতে পারতেন।"
"তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে? "
"খুব ভালো। "
"তুমি অনেক বড় আইনজীবী হবে। হয়তো বিচারক হবে। "
"দোয়া করবেন। "
" দোয়া চাইতে হবে না। সব সময় দোয়া করি।কবরে শুয়েশুয়েও দোয়া করব। "

কথা বলতে বলতে রাশমিন উঠে দাঁড়ালো। ফুলগুলো আমার হাতে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,   "এগুলো আপনার জন্য। "

তার হাত থেকে ফুলগুলো নিতে নিতে আঁতকে  উঠলাম। আমি কি ভুল দেখলাম? দরজায় হ্যাটট্রিক দাঁড়িয়ে। চোখাচোখি হতেই বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের মত সে সরে গেল। হঠাৎ আমার শরীর মন ব্যথার বিষে জর্জরিত হয়ে উঠলো। কি করবো ভেবে পাচ্ছিনা। বেদনার্ত চোখ দুটো লুকানোর জন্য  মাথা ঘুরিয়ে ফুল রাখার পাত্র খুঁজতে লাগলাম। রাশমিন চলে গেল। 




লেখক :হুমায়ূন কবীর,পিতা - রোস্তম আলী বিশ্বাস 
মোবাইল 01750 916986

মানিকদিহি,সদর,যশোর। 
বাংলাদেশ।

অথবা 

মঙ্গলপৈতা, কালিগঞ্জ, ঝিনাইদহ। 
পেশা- শিক্ষকতা



১।
ক্যাম্পাস প্রেম' হুমায়ূন কবীরের লেখা একটি জনপ্রিয় উপন্যাস
, যা ক্যাম্পাস জীবনের রোমান্টিকতা, আবেগ ও বাস্তবতাকে তুলে ধরে, যেখানে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের প্রেম-ভালোবাসা, বন্ধুত্ব এবং তাদের স্বপ্ন-হতাশার গল্প বলেছেন।তার লেখায় গভীর জীবনবোধ ও রাজনৈতিক চেতনার ছোঁয়া পাওয়া যায়। 
উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু:
  • রোমান্টিকতা ও সম্পর্ক: এটি মূলত তরুণ-তরুণীদের ক্যাম্পাস জীবনের প্রেম ও সম্পর্ক নিয়ে লেখা, যেখানে একে অপরের প্রতি আকর্ষণ, ভুল বোঝাবুঝি, এবং ভালোবাসা ফুটে ওঠে।
  • বাস্তবতার ছোঁয়া: শুধু প্রেম নয়, বরং  ছাত্র জীবনের বাস্তবতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক নানা বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত আছে। 
  • চরিত্র ও পরিবেশ: গল্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, ক্লাস, আড্ডা, ক্যাফে, লাইব্রেরি ইত্যাদির বর্ণনা আছে , যা পাঠককে নস্টালজিয়ায় ভাসায়।
  • অনুভূতি: উপন্যাসটি পাঠককে ক্যাম্পাসে নিজেদের ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি এবং প্রেমের প্রথম অনুভূতিগুলো ফিরিয়ে নিয়ে যায়। 
২।
হুমায়ূন কবীর। জন্ম ১৯৭৯ সালে ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার মঙ্গলপৈতা গ্রামে।পিতা:- রোস্তম আলী বিশ্বাস, মাতা:- খাদিজা বেগম।আট ভাইবোনের ভিতর সবার ছোট।

যশোর সরকারি এম, এম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর। 
বর্তমান পেশা, শিক্ষকতা।
স্ত্রী, শারমিন আক্তার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। 
মেয়ে,হুমায়রা বিশ্বাস রোদেলা। ছেলে,সায়মন বিশ্বাস সূর্য। 

প্রকাশিত বই,"একজন ভালো ছাত্রের কষ্টের জীবন"। উপন্যাসটি 'সাপ্তাহিক চৌগাছা' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। 

জাতীয় এবং স্থানীয় অনেক পত্রিকায় লেখা প্রকাশ হয়েছে। অনলাইনেও সমান জনপ্রিয়। 
যেসব পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে, 
'দৈনিক লোকসমাজ', 'দৈনিক রানার', 'দৈনিক যশোর বার্তা, 'সাপ্তাহিক চৌগাছা', 'দৈনিক গড়বো বাংলাদেশ'। '

অনলাইন পত্রিকা, 
অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত 'সুপ্রভাত সিডনি', 'প্রভাতফেরি '।

রাজনৈতিক পরিচয়, সভাপতি, জিয়া সাংস্কৃতিক সংগঠন, জিসাস, ঝিনাইদহ জেলা শাখা।












মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাগলা সন্ধ্যা, নীল চাঁদ, হুমায়ূন কবীর মাসয

আজ বুধবার, পর্ব২