আজ বুধবার, পর্ব২

 




আজ বুধবার, পর্ব২
হুমায়ূন কবীর মাসয

মিঠাইমনি বাজারে সবচেয়ে বড় দোকানটি মতি মাস্টারের।দোকানের নাম" মা ভ্যারাইটি স্টোর"।
মায়ের প্রতি তার অগাধ ভক্তি। লোকে বলে,মা'কে ছেড়ে থাকতে না পেরে সে মেডিক্যালে পড়া বন্ধ করে বাড়ি ফিরে এসেছে। তার হওয়ার কথা ছিলো ডাক্তার। সে হয়েছে মুদি দোকানদার। তাতে তার কোনো আফসোস নেই। সে মনের সুখে মহা আনন্দে এই অজপাড়া গায়ের ছোট্ট বাজারে দোকানদারি করছে।আর বুধবার মাস্টার সেজে ভাইপো দুটোকে মনের স্বাদ মিটিয়ে ঠ্যাঙাচ্ছে।

আছরের নামাজ শেষ হয়েছে।  মা ভ্যারাইটি স্টোরে খুব বেচাকেনার ভিড়।কাদের আর আরিফ দোকানের সামনে বেঞ্চে বসে বাদাম খাচ্ছে। 

খট,খটাখট।খট,খটাখট। 

ও,ভাই!ছোলা আছে,ছোলা?

মতি মিয়া ওজনের জন্য  দাঁড়ির উপর জিরা রাখছিলো। ঔদ্ধত্যপূর্ণ কণ্ঠ শুনে বিরক্ত হয়ে তাকালো রাস্তার দিকে।বেঞ্চে বসে আছে কাদের, আরিফ। আজ মিঠাইমনি হাটবার।বাজার করে দিলে ওরা বাড়ি নিয়ে যাবে।

হাটবার বলে রাস্তার উপর লোকের ভিড়।ভিড়ের ভিতর একটা লাল রংয়ের তেজি ঘোড়া দাঁড়িয়ে। ঘোড়ার উপর পুচকে একটা ছেলে- আরিফের বয়সী।
ঔদ্ধত্যপূর্ণ কণ্ঠ তারই।

মতি মিয়া বিরক্ত হয়ে একবার তাকালো। তারপর জিরা ওজনে মন দিলো।রাগে তার চোখ লাল, নিচের মোটা ঠোঁট ফাঁক - ঝুলে পড়েছে। 

আরিফ আতংকিত চোখে ঘোড় সওয়ারটার দিকে তাকালো। এর কপালে কী যে শাস্তি আছে।ধাক্কা দিয়ে তাকে ঘোড়ার উপর থেকে ফেলেও দিতে পারে।

" কী হলো,কানে শোনেন না?ছোলা নেই? "

"না।"
" মিথ্যা বলছেন কেন?ঐ যে বস্তায় ছোলা। "
" বলছি তো নেই। "
"দেখছি তো আছে। "

" দেখছিস, তবে জিজ্ঞেস করছিস কেন?"

" পাঁচ কেজি ছোলা দেন।"
"দেরি হবে।"
" দেরি হবে কেন?এক্ষুনি দেন। আমি ছোবদুলির লোক।"

কথা বলতে বলতে ছেলেটি মারমুখী ভঙ্গিতে ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নামলো।

আরিফ অবাক হয়ে দেখছে।মতি মিয়া তাকে নিয়মিত মারে।আজ মনে হয় স্বয়ং মতি মিয়া মাইর খাবে।খুব মজা হবে।

ছোবদুল এই অঞ্চলের বড় সন্ত্রাসী। তার নামে এখানে বাঘে মহিষে এক ঘাটে পানি খায়।নো বিরোধ, নো টু শব্দ। 


কিন্তু মতি মিয়া মনেহয় ব্যতিক্রম।সে ছেলেটির কথার কোনো গুরুত্বই দিলো না। 


ছেলেটি চিৎকার করে উঠলো, " কই,দেন।"

মতি মিয়া জিরা মাপা শেষ করে,সরিষার তেলের বোতল বের করলো,তারপর টুথপেস্ট। 


শমসের গাজী এই দোকানের নিয়মিত খরিদদার। মতি মিয়া আগে তার মাল দিচ্ছে। 

 
ছেলেটি আবার চিৎকার করে উঠলো," আগে আমাকে ছেড়ে দেন।"

" তোকে ধরে রেখেছে কে?"

এইবার ছেলেটির হুঁশ হলো।এ যে তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না।হুমকি ধামকি দিয়ে লাভ নেই। ছোবদুলের মতো বড় খুনিকে যে ভয় পায় না,তার নামে বিচলিত হয় না - সে সোজা লোক না।কিন্তু দেখে তো বোকাসোকা গো বেচারি মনে হচ্ছে।

ছেলেটি মতিমিয়ার দিকে ভালো করে তাকালো।কি উদভট গোঁফ। ডানে-বামে ফাঁকা। শুধু নাক বরাবর মাঝখানে চার কোনা - হিটলার মার্কা হাস্যকর গোঁফ। ছেলেটি মতি মিয়াকে চরম ভিতু এবং বোকা ভেবে বললো," দাঁড়া তোর দেখাচ্ছি মজা।ঐ যে ছোবদুল ভাই।"

"ছোবদুল ভাই,  ও ছোবদুল ভাই। "

ডাকাডাকিতে ছোবদুল এগিয়ে এলো।বিরাট পাহাড়ের মতো লোক। সাত ফুট লম্বা। ভয়ংকর তার চেহারা।এসেই বিরাট ভাব নিয়ে বললো," এই কি রে ভাগনে, কী হয়েছে?"

" আরে তোমাদের হাটের এই দোকানদার বিরাট বেয়াদপ, কথা শোনে না মামু।ছোলা চাচ্ছি, দিচ্ছে না। তোমার নাম বললাম, পাত্তা দিচ্ছে না।"

" তুই বেয়াদবি করিসনি তো?"
" কী?"
ছেলেটি বিস্মিত। 

ছোবদুল বললো," বেয়াদবি করিসনি তো? উনি কিন্তু আমার স্যার।"

" ধুততোর স্যারের গুষ্টি। "

কথা শেষ হতে না হতেই ছোবদুল ছেলেটির পাছায় লাথি কষে দিলো।সে হুমড়ি খেয়ে পড়লো রাস্তায়।

তারপর চরম রেগে বললো," যা হারামজাদা, আমার স্যারের কাছে মাফ চা।"


মতি মিয়া ঝুলে থাকা মোটা ঠোঁটে মৃদু হেসে বললো, " মাফ চাইতে হবে না। ওর ঐ হাতের লাঠির ছড়া আমার খুব পছন্দ হয়েছে। রেখে যেতে বল।"

" হু।কাল আমার দৌড় প্রতিযোগিতা। আর আজ আমি লাঠির ছড়া রেখে যাবো? ঘোড়া ছুটাবো কী দিয়ে? "

মতি মিয়া বিরক্ত হয়ে বললো," তোর ঝোলায় আরও তো লাঠি আছে। "

মতি মিয়ার কথা শুনে এইবার ছেলেটি ভয় পেলো।সত্যি সত্যি তার ঝোলায় আরও লাঠি আছে। কিন্তু এ জানলো কী করে? ঝোলা তো ঘোড়ার পিঠে।এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না।এ লোক নিশ্চিত গুনিন। ছেলেটি ভয়ে বেতের লাঠি ছড়া ফেলে পালিয়ে গেলো।

ছোবদুল, আরিফ, কাদের - তিনজনই অবাক হয়ে মতি মিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটা কি জাদু জানে?

মাস্টারিতে নিষ্ঠুরতার চরম উদাহরণ মতি মাস্টার। আজ থেকে তার নতুন আরেকটি পরিচয় পাওয়া গেলো, জাদুকর।

আরিফ করুন কষ্ট মিশ্রিত দৃষ্টিতে বেতের লাঠিটার দিকে তাকিয়ে আছে। নিশ্চয়ই আগামী বুধবার ওটা তার পিঠে ভাঙবে।আসন্ন ব্যথায় তার পিঠ টনটন করে উঠলো।মনের অজান্তেই তার ডান হাত চলে গেলো পিঠে।





 












মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ক্যাম্পাস-প্রেম,প্রেমেরউপন্যাস

পাগলা সন্ধ্যা, নীল চাঁদ, হুমায়ূন কবীর মাসয